চট্টগ্রাম বুলেটিন

চট্টগ্রামে বন্ধ আদালতের কার্যক্রম, আইনজীবী আলিফের দ্বিতীয় জানাযায় মানুষের ঢল

চট্টগ্রামে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনায় খুন হওয়া আইনজীবী সাইফুল ইসলামের আলিফের দ্বিতীয় নামাজে জানাযা নগরের জমিয়তুল ফালাহ কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেলা এগারোটায় অনুষ্ঠিত জানাযার নামাজে মানুষের ঢল নামে। কানায় কানায় পূর্ণ হয় জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের মাঠ ও আশেপাশের এলাকা৷

এদিকে গতকাল রাত থেকেেই ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে উত্তাল হয়ে চট্টগ্রামসহ সারাদেশ। আজ আলিফের জানাযার নামাজ শেষে সাড়ে এগারোটায় নগরের টাইগারপাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সংহতি সমাবেশ পালন করে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হাসানত আব্দুল্লাহ ও সদস্য সচিব সারজিস আলম। সমাবেশে ছাত্র-জনতার সমুদ্রে রূপ নেয় টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার৷ পরে সমাবেশ থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ছাত্ররা বহদ্দারহাটের থেকে যাত্রা শুরু করে।

অপরদিকে হত্যার প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করছেন চট্টগ্রামের আইনজীবীরা। আজ বুধবার সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামের ৭৪টি আদালতের সব কার্যক্রম। যদিও সকাল থেকে আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করছেন।

বুধবার বেলা সাড়ে ১০টার দিকে আদালত প্রাঙ্গণে খুনের শিকার আইনজীবী সাইফুল ইসলামের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এসনয় তার কফিনকে ঘিরে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন বহু আইনজীবী। তারা অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেন।

এসময় জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার তোফায়েল আহমেদ, নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ, সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান, নগর জামায়াতের আমির শাহজাহান চৌধুরী, সেক্রেটারি জেনারেলে নুরুল আমিন, হেফাজত নেতা মুফতি হারুন ইজাহার প্রমুখ।

মহানগর জামায়াতের আমীর শাহাজাহান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, এর আগে ইসকন এসিড হামলা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর। গতকাল তারা নৃশংসভাবে কুপিয়ে একজন আইনজীবীকে হত্যা করে। তারা সন্ত্রাসী। তাদের মোটিভ স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনা। তিনি আরও বলেন, চিন্ময় দাশকে হিন্দু হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাস্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি হিসেবে। সে জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছে। তারাতো শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে পারতো। তারা তা না করে মসজিদ ভাঙচুর, গাড়ি ভাঙচুর এবং ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। আমাদের একজন আইনজীবীকে হত্যা করেছে। আমরা এর বিচার চাই।

সিএমপির উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) এ এন এম হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, আজ সকাল থেকে চট্টগ্রাম আদালতের সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোনো মামলার শুনানি হচ্ছে না। বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আসা মামলার বাদী ও হাজিরার দিন ধার্য থাকা আসামিরা ফেরত যাচ্ছেন। মামলাগুলোতে পরবর্তী তারিখ রাখা হচ্ছে।

জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ও ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মচারীকে জাতীয় পতাকা অবমাননার রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তোলা হয়। এ সময় আদালত তার জামিন নাম মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ঠিক ওই মুহূর্তে তার প্রিজন ভ্যান আটকে দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন চিন্ময় অনুসারী ইসকন সদস্যরা।

দুপুর পৌনে তিনটার দিকে পুলিশ তাদেরকে সরাতে টিয়ারশেল ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ পর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। চিন্ময় অনুসারীরা আদালতের মসজিদ ও গাড়ি ভাঙচুর করে। আইনজীবী ও সাধারণ মুসল্লীরা প্রতিবাদ জানালে তাদের সঙ্গেও সংঘর্ষ শুরু হয়। বিকালে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের মূল ফটকের সামনে রঙ্গম সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকায় সাইফুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) ছিলেন। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে পড়শোনা শেষ করেন লোহাগাড়ার এই সন্তান।

এদিন সংঘর্ষে ১০ পুলিশ সদস্যসহ আহত হন অন্তত ৩৭ জন। সংঘর্ষের মধ্যেই প্রায় ৫ ঘণ্টা পর বেলা তিনটার দিকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত সোমবার বিকালে রাজধানী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চিন্ময় কৃষ্ণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার একটি রাস্ট্রদ্রোহ মামলায় আনা হয়। গত ৩১ অক্টোবর নগরের চান্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাশসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা করেন। পরে ফিরোজ খানকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মফিজুর রহমান বলেন, চিন্ময়ের জামিনের আবেদন করা হলে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। কারাগারে নেওয়ার সময় চিন্ময় কৃষ্ণর ভক্তরা প্রিজন ভ্যানের আশপাশে অবস্থান নেন। বারবার অনুরোধ করা হলেও অবস্থানকারীরা প্রিজনভ্যানটি ছাড়েননি। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ডিভিশনের আদেশ দিয়েছেন। একইসাথে চিকিৎসা ও ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় কারাবিধি অনুযায়ী সে ব্যবস্থা নিতে জেল সুপারকে নির্দেশ দেন।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর আইনজীবী স্বরূপ কান্তি নাথ গণমাধ্যমকে বলেন, গতকাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় মহানগর দায়রা জজ আদালতে আপিল করে জামিনের আবেদন করা হয়। আজ এটির শুনানির দিন ধায্য থাকলেও পরবর্তী তারিখ এখনো জানা যায়নি।

 

Tags :

সর্বশেষ