কখনও সন্ত্রাসীর স্ত্রীকে পিটিয়ে ভ্রুণ হত্যার অভিযোগে মামলা, কখনও শেখ মুজিবরকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্য ভাইরালে, আবার কখনও রিমান্ডের আসামিকে প্রকাশ্যে ঘুরিয়ে মাইকিং করা নিয়ে তুমুল সমালোচনা, কখনওবা ছাত্রদল নেতাকে বহিস্কার করানোর অডিও ফাঁসের ঘটনায় আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছেন তিনি। শুধু তাই নয় তিনি বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তবে এসবের পরও তিনি স্বপদে বহাল আছেন একই স্থানে। সচেতন নাগরিকরা তার পেশাদারিত্ব নিয়ে পুলিশের কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এতে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে নগর পুলিশ।
তিনি আর কেউ আর নন নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমান। সর্বশেষ তার একটি কলরেকর্ড ফাঁস হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যা ব্যাপক আলোচনার সমালোচনার মুখে পড়ে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা কিভাবে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করাতে পারেন তা নিয়ে যেমন বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। তেমনি তিনি (ওসি) তার জুরিশডিকশনের বাইরেও কাজ করেছেন বলেও মন্তব্য অনেকের।
ভাইরাল ওই অডিও রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, সম্প্রতি তিনি কোন এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছেন। এর আগে ওই ব্যক্তির ভাইকে গ্রেফতার করেছেন। যিনি নগর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তাকে নিয়ে সভাপতিকে বলে বহিস্কার করিয়েছেন।
এতে আরও বলতে শোনা যায়, সেই ছাত্রদল নেতার কেন্দ্রীয় লবিং ভালো এবং প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল নোমানের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। সে বিএনপি করে বিধায় আওয়ামী লীগ আমলে পাহাড়ে নিয়ে তাকে ক্রসফায়ারে দেয় এবং একটা পা নষ্ট করে দেয়। ওইটার চিকিৎসার টাকা দেয় সরাসরি তারেক রহমান। ওই ছাত্রদল নেতা হলেন নগর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফ।
আরেকটি অডিওতে ওসি আরিফুর রহমানকে পাঁচলাইশের ওসি মুহাম্মদ সোলাইমানের চরম বিষোদগার করতে দেখা যায়। সেখানে তিনি বলছেন, পাঁচলাইশের ওসি মুহাম্মদ সোলাইমান সবকিছু করতেছেন। তিনি আমার বিরুদ্ধে কমিশনার স্যারকে প্যাঁচ লাগিয়েছেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন তার পেশাদারিত্ব নিয়ে। তারা বলছেন, কি করে ওসি আরিফুর রহমান ছাত্রদল নেতাকে বহিস্কার করান। তিনি কি দলীয় নেতা নাকি? এছাড়াও তার তারেক রহমানকে নিয়ে অপতথ্য সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। দেশের অন্যতম বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনকে নিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করার স্পর্ধা কি করে দেখান। তার কাছে কি প্রমাণ রয়েছে যে তারেক রহমান টাকা দিয়েছেন। তাকে পুলিশ থেকে সাসপেন্ড করারও দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
জানা যায়, বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি হিসেবে গেল বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী যোগ দেন পুলিশ পরিদর্শক আরিফুর রহমান। কিন্তুু এরপর থেকে একের পর বিতর্কের মুখে পড়ছেন। বিতর্কই যেন তার সঙ্গী। গেল বছরের ৫ ডিসেম্বর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে ধরতে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হন। উল্টো সাজ্জাদ পুলিশকে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। তবে সাজ্জাদকে না পেয়ে তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে ধরে নিয়ে আসেন ওসি আরিফুর রহমান।
কিছুদিন পর জেল থেকে বের হয়ে ওসি আরিফুর রহমানসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন তামান্না শারমিন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পুলিশি হেফাজতে সীমাহীন নির্যাতন করা হয় তামান্নাকে। আর সেই নির্যাতনে আর গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। ভ্রুণ হত্যার অভিযোগে করা সেই মামলায় তামান্না শারমিন বলেন, আমাকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে মামলা দিয়ে চালান করে ওসি আরিফ। কিন্তুু আমার কি অপরাধ। আমার গর্ভের অনাগত সন্তানের কি দোষ?
তিনি সম্প্রতি অভিযোগ করেন, কোন অপরাধে জড়িত না থাকলেও রাগের বশ্ববর্তী হয়ে ওসি আরিফুর রহমান তাকে একে একে তিনটি মামলায় আসামি করেছেন। এর মধ্যে একটি পুলিশের কাজে বাধায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায়। একটি পাঁচলাইশ থানায় ১ কোটি টাকা চাঁদাদাবির অভিযোগে। অন্যটি বাকলিয়ার ডাবল মার্ডার মামলা। তিনি বলেন, আমি নারী মানুষ। একজনকে বিয়ে করেছি। তা কি আমার অপরাধ। যেখানে আমার স্বামী রিমান্ডে সেখানে কি করে সে ডাবল মার্ডার করল? আর আমিতো তার চিন্তায় চিন্তায় শেষ…
এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরিফুর রহমানের একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়ে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে উচ্চকণ্ঠে দেওয়া সেই বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি। তিনি না হলে কখনও বাংলাদেশ হতো না। তাকে সর্বদা স্মরণ করা উচিত। সেই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ৪১ সালের ভিশন বাস্তবায়ন করতে হবে। তাকে ৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখলে বাংলাদেশ বদলে যাবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন অনেকেই। সেসব মন্তব্যের বেশির ভাগেই সমালোচনা করা হয়েছে, প্রমোশন পেতে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবকে অতিরিক্ত তৈলমদ্যন করেছেন ওসি আরিফ। বক্তব্যটি দেওয়ার সময় তিনি কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ছিলেন। ওই বক্তব্যে তিনি সেখানকার আওয়ামী লীগের তৎকালীন বিতর্কিত সংসদ সদস্যকে এগিয়ে নিতে সবাইকে তার পেছনে কাজ করার পরামর্শ দেন।
রাজনৈতিক সচেতন মহল বলছেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তা কখনো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পিছনে কাজ করার কথা বলতে পারেন না। তাছাড়া দল ও দলের পূজা ব্যক্তিকে নিয়ে অতিরিক্ত সুনাম করে রাজনৈতিক স্টাইলে বক্তব্য দেওয়া সমীচীন নয়। এটি করবেন রাজনৈতিক নেতারা। কিন্তু ওসি আরিফ তা করে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে তফাৎ রাখেননি। তিনি সরকারি চাকরি বিধিমালা ভঙ্গের পাশাপাশি নিজেকে একজন সাচ্ছা আওয়ামী লীগার হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
শুধু আওয়ামী লীগের পক্ষে বক্তব্যই নয়, নানাভাবে বিতর্কিত বায়েজিদ থানার ওসি আরিফ। সম্প্রতি পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে তাকে রাউজানের কদলপুর এলাকায় নেওয়ার পর শোডাউন করে আরিফুর রহমান। প্রকাশ্যে তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘুরিয়ে মাইকিং করতে দেখা যায় এ কর্মকর্তাকে। মাইকিং এ তিনি দাবি করেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের নির্দেশে গত ১৫ মার্চ ঢাকা থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করা হয় নারী উদ্যোক্তা ও তার স্বামীর দেওয়া তথ্য মতে। যে দম্পতি সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করিয়ে এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। পুলিশ তার নিরাপত্তা দিতেও রীতিমতো ব্যর্থ। যেখানে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতারে পুলিশের কোন কৃতিত্বই নেই সেখানে ক্রেডিট নিতে অভিযানের নামে শো-ডাউন করায় সমালোচনার মুখে আসেন ওসি আরিফসহ সহ পুরো নগর পুলিশ।
এ ঘটনার পর নানা জন প্রশ্ন তুলেছেন। বলা হচ্ছে বেশ কয়েক দফায় ছোট সাজ্জাদকে রিমান্ডে নিয়ে একটিও অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। কিন্তু মাইকিং করে শোডাউন করে ক্রেডিট নিতে ব্যস্ত আছেন আরিফুর রহমান।
ইরফান আলম নামে এর আগে ফেসবুকে লেখেন, এই পোলারে পুলিশ ডন বানিয়ে দিলো, অর্থাৎ যতোটা তার চেয়ে বেশি বানায় দিলো। অর্থাৎ শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ আরো বেশি পরিচিতি পেয়ে গেল। ওই দফায় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অস্ত্র উদ্ধার, আসামি গ্রেপ্তার, আইনের বিধান মানা, মাঠ পর্যায়ে কার্যকারিতা ও বিচক্ষণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ব্যক্তি।
এদিকে আরিফুর রহমান, বায়েজিদের এসআই মেজবাহ, এএসআই সৈয়দ আবুল হাশেমের বিরুদ্ধে টাকার জন্য নামের মিল পাওয়ায় মেজবাহ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানোর অভিযোগ ওঠেছে। গত ২৩ এপ্রিল সিএমপি কমিশনার বরাবরে দেয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে ভুক্তভোগী মেজবাহ উদ্দিন পাঁচলাইশ থানা যুবদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য। ৫ আগস্ট এর আগেও স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের আমলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিপরাধ ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছিলেন। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা মঈনুদ্দিন আহমেদ মুবিনের দায়ের করা মামলায় মেজবাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে গত ২০ এপ্রিল আদালতে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তারকালে মেজবাউদ্দিন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মেজবাহ উদ্দিন নয় দাবি করলে ওসি আরিফসহ আরো দুই পুলিশ কর্মকর্তা তার কাছে অর্থ দাবি করে। এক পর্যায়ে ওসি আরিফুর রহমানকে স্যার না বলায় তাকে কিল ঘুষি মেরে আহত করে আরিফ।
অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয় আওয়ামী পুলিশ কর্মকর্তা ওসি আরিফুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বাছাই করে করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করে আসছে। মূলত এখনো তিনি স্বপদে বহাল থেকে পুলিশের কিছু কর্মকর্তার আশ্রয় প্রশ্রয়ে আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত। তিনি মনে করেন এখনো তার নেত্রী শেখ হাসিনা দেশ চালাচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে কল করা হলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, কল রেকর্ডগুলো ভুয়া। আমরা যখন সন্ত্রাসীদের ধরতে যাই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করি তখনই তারা নানা কিছু বের করে সেগুলো ভাইরাল করে। একথা বলেই আরিফুর রহমান ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উত্তর বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যার মন্তব্য দেখেছেন তাকে (ওসি) প্রশ্ন করুন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক নেতার মতো বক্তব্য দিতে পারেন কিনা, কাউকে বহিস্কার করানো তার কাজ কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা আপনিই ভাল জানেন। এ সময় আরিফুলের ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে অপর প্রান্তের অফিসারের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তাও জানেন না বলে দাবি করেন।