ছাত্রজনতার আন্দোলনের মুখে গেল ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে পাশের দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন স্বৈরশাসক ও গণহত্যাকারী খ্যাত হাসিনা। এরপর থেকে দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ নিতে শুরু করে দেশের মানুষ। স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নেয় ১৭ বছর ধরে জেল-জুলুমের শিকার হয়ে আসা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা। সুযোগ সৃষ্টি হয় উন্মুক্ত পরিবেশে স্বাধীনভাবে মিছিল, সভা-সমাবেশ করার। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হাতে নিয়েছে একগুচ্ছ পরিকল্পনা। দলটি পাড়ায় পাড়ায়, ওয়ার্ডে কর্মী ও সহযোগী সদস্য সম্মেলন করছে। প্রায় প্রতিদিনই তাদের কোন না কোন ওয়ার্ডে চলছে সম্মেলন। এসব সম্মেলনে মিলছে দারুণ সাড়াও।

রাজনীতি সচেতন মানুষেরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী এই স্বাধীনতার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। অন্য দলগুলো তেমন কোন কর্মসূচী না দিলেও জামায়াত নেতারা নানা কর্মসূচীতে ব্যস্ত। তাদের কর্মীরা রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এসব কর্মসূচী বাস্তবায়নে। বস্তুত দলটি বিগত ১৭ বছরে প্রতিকূল পরিবেশে তাদের কার্যক্রম অনেকটা গোপনে চালালেও এবার সরাসরি জনতার সাথে দেখা করতেই এই পরিকল্পনা।

জামায়াত নেতারা বলছেন, আমাদের সাথে সবসময় আপামর জনতার সম্পৃক্তা ছিল এবং আছে। জামায়াত গণমানুষের দল। এদেশের মেহনতি মানুষ জামায়াতকে পছন্দ করে। আওয়ামী তথ্য সন্ত্রাসের ফলে জামায়াত সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মাঝে এ ধরণের নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াত সংগঠন সম্পর্কে জনগণকে জানাতে চায়। সেইসাথে স্বৈরাচারী হাসিনা পাঠ্য পুস্তকে জামায়াত সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি করেছে। আমরা সেগুলো দূর করতে চাই। ইসলামী রাস্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুফলের কথা শোনাতে চাই। ঘরে ঘরে কুরআনের দাওয়াত দিতে চাই। এই স্বাধীনতাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই।
জানা গেছে, সারাদেশের মতো বৃহত্তর চট্টগ্রামের সব জেলায় চলছে জামায়াতের কর্মী ও সহযোগী সদস্য সম্মেলন। একইসাথে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির করছে কর্মী ও সাথী শিক্ষা শিবির। এসব সম্মেলন ও শিক্ষা শিবিরে জামায়াত-শিবির সব ধরণের জনশক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করছে। সেখানে জামায়াত ও শিবিরের মহানগর, জেলা, উপজেলার নেতারা উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখছেন। তাদের একটিই মেসেজ সংগঠনকে মজবুত করে ঘরে ঘরে সংগঠনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। সেইসাথে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে যেন একসাথে কাজ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জামায়াত ওয়ার্ড কর্মী সম্মেলন শুরু করে। জেলার সীতাকুণ্ড, মিরসরাইয়ে প্রায় সব ইউনিয়নে কর্মী সম্মেলন শেষ দিকে। এখনও কোন কোন ওয়ার্ডে চলছে এই কর্মসূচী। সর্বশেষ গত শুক্রবার সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিশাল কর্মী সম্মেলন করে দলটি। সম্মেলন দুটি নেতাকর্মীদের ঢল নামে।

উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, আমরা দুই দলের শাসন দেখেছি। কে কিভাবে দেশ চালিয়েছে তা সকলেই জানি। পৃথিবীতে জামায়াতে ইসলামী ব্যতিত এমন কোন দল নেই যেই দলের নেতা রাস্ট্রীয় কোষাগারে রাস্ট্রের টাকা ফেরত দিয়েছেন। জামায়াত দেশ পুরোপুরি শাসনের সুযোগ পায়নি৷ কিন্তুু ৩ টা মন্ত্রণালয় আমরা চালাতে পেরেছি, আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিয়েছেন। আমরা শিল্প, কৃষি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছি। তত্বাবধায়ক সরকার বাঁতি দিয়ে খুঁজেও আমাদের দুর্নীতি পায়নি। উল্টো আমাদের নেতা তাঁর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা খরচের পর অবশিষ্ট অংশ রাস্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন। একবার জামায়াতের একজন মন্ত্রী কুমিল্লায় গিয়েছিলেন সরকারি কাজে। তিনি সেখানে দুপুরের খাবার খাননি৷ কিন্তুু দপ্তরের অফিসাররা ওনাকে ২ লাখ টাকার চেক দিয়ে দেন লাঞ্চ বাবদ। ওনি বললেন, এগুলো কিসের বিল? অফিসার বললেন, স্যার দুপুরের খাবারের। তিনি বললেন, আমিতো সেখানে খায়নি। তাহলে কিসের বিল? অফিসার বললেন, স্যার এটা আপনাকে সেজন্য দিয়ে দিলাম যেহেতু আপনি খাননি। মুহুর্তেই সেই অফিসারের চাকরী চলে যায়। এটার নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মন্ত্রীরা, এমপিরা কখনও সফরে গেলে সরকারি টাকা নষ্ট করে না। ওনারা ওই এলাকার আমীরকে বলেন, আমি আসতেছি, আমার জন্য খাবার রেডি রাখেন। আপনার বলেন, জামায়াত এতো টাকা কোথায় পায়? আমরা যারা জামায়াত করি তাদেরকে মাসিক আয়ের ৫ শতাংশ সংগঠনকে দিয়ে দিতে হয়। এটার নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সম্মেলনে ওয়ার্ড সভাপতি আবুল হাসেমের সভাপতিত্বে এবং সীতাকুণ্ড পৌরসভার শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সভাপতি জনাব মাহমুদুল করিমের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শুলকবহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী। প্রধান বক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক, সীতাকুণ্ড -৪ সংসদীয় আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সহ-সভাপতি সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ আবু তাহের। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলা আমীর মাওলানা মিজানুর রহমান, বক্তব্য রাখেন সীতাকুণ্ড উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী এডভোকেট আশ্রাফুর রহমান, মু. কুতুবউদ্দিন শিবলী। আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন সীতাকুণ্ড পৌরসভা জামায়াতের আমীর হাফেজ আলি আকবর, সেক্রেটারী মাস্টার গিয়াসউদ্দিন পারভেজ।

অপরদিকে পৌরসভার আলী আজগর জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক চসিক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী, উপজেলা আমীর মাওলানা মিজানুর রহমান। পৌর আশীর হাফেজ আলী আকবরের সভাপতিত্বে ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের দায়িত্বশীল মো. মোতালেবের সঞ্চালনায় এতে উপস্থিত ছিলেন, সাবেক উপজেলা আমীর তাওহীদুল হক চৌধুরী, এসিসট্যান্ট সেক্রেটারী এডভোকেট আশরাফুর রহমান, উপজেলা জামায়াতের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক শামসুল হুদা, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আলাউদ্দিন সোহেল, পৌরসভা শ্রমিক কল্যাণের সভাপতি মাহমুদুল করিম প্রমুখ।