চট্টগ্রাম বুলেটিন

ফেরীর যুগে পা রাখল সন্দ্বীপ, দুপারেই আনন্দের জোয়ার, প্রভাব পড়বে উড়িরচর, সুবর্ণচরেও

বিশেষ প্রতিনিধি:


এক বুক পানি, হাঁটু সমান কাঁদা, বগলে স্যাণ্ডেল, কোলে শিশু আর মাথায় ভারী ব্যাগ। ভাটা হলে এভাবেই পানি থেকে ডাঙায় ওঠতে হয় সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের। আর জোয়ার হলেও ভারী মালপত্র নিয়ে ট্রলার থেকে লাফাতে হয় লাল বোটে। সেইসাথে গুণতে হয় বাড়তি টাকা। এছাড়াও বিকাল পাঁচটার পর চট্টগ্রামের এই দ্বীপ উপজেলাটি মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কোন প্রসূতি নারী কিংবা গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে হলে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনা। ফলে চিকিৎসার অভাবেই অনেকে ঝরে গেছেন অকালে। তবে এখন সেই দিন শেষ। অতিতের সকল দুঃখ, কষ্ট, ভোগান্তির ইতি টেনে সূচনা হয়েছে এক নতুন দিগন্তের। শুরু হয়ে চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌ রুটে (সন্দ্বীপ চ্যানেল) ফেরী চলাচল। যা সমুদ্র পথে বাংলাদেশে প্রথম ফেরী চলাচল।

সোমবার (২৪ মার্চ) সকালে সেই বহুল কাঙ্খিত স্বপ্ন ধরা দেয় দ্বীপবাসীর কাছে। আর এতেই এপারে-ওপারে বয়ে যায় আনন্দের জোয়ার। প্রধান উপদেষ্টা ডা. মুহাম্মদ ইউনূস ভার্চুয়ালি এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফেরী চলাচলের উদ্বোধন করেন। মুহুর্তেই আনন্দে ভেসে যায় দ্বীপবাসী। তারা সবাই অন্তর্বর্তীকালিন সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

এদিন সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরীঘাটে সকাল নয়টায় সরকারের নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম শাখাওয়াত হোসেন বিআরটিসি বাস টার্মিনাল উদ্বোধন করেন। এরপর ৬ উপদেষ্টাসহ প্রথম যাত্রী হিসেবে ফেরীতে ওঠে সন্দ্বীপে রওয়ানা দেন। ওপারে (গুপ্তছড়া ফেরীঘাট) বেলুন, পোষ্টার, পেষ্টুনে সাজানো হয়েছে আশপাশ। চারিদিকে সাজসাজ রব। উপদেষ্টাদের বহনকারী কপোতাক্ষ ফেরী ভিড়ার সাথে সাথে স্থানীয়রা উপদেষ্টা দলকে হাততালি দিয়ে স্বাগত ও অভিনন্দন জানান।

পরে উপজেলা কমপ্লেক্সে এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘অবশেষে চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সন্দ্বীপের একটি নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হলো। যেটি ছিল না। এটি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। সন্দ্বীপের এতগুলো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর অতিক্রম করতে হয় ডিঙ্গির মতো নৌকা দিয়ে। এটি খুবই লজ্জার বিষয়। একটি সুন্দর সুস্থ পরিবেশ কেন আমরা এতদিন করতে পারলাম না, এটা বুঝে আসে না। আজ সবার প্রচেষ্টায় এ লজ্জা থেকে বাঁচলাম। একটা নিরাপদ যোগাযোগ স্থাপিত হলো।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপের মধ্যে সরাসরি ফেরি চালু করা। স্বাধীনতার মাসে আপনাদের এই সুখবর দিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। সন্দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম উপকূলীয় দ্বীপ। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও ঐতিহ্যবাহী এই জনপদের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। কী লজ্জার কথা! ৫০ বছর পার হয়ে গেল, এদিকে একটা বিরাট শহর, বিরাট বন্দর-সবকিছু চলছে। কিন্তু নিজের বাড়ি যাওয়ার সময় মধ্যযুগীয় অবস্থার মধ্যে আমাদের চলে যেতে হয়। আজকে সে কলঙ্ক থেকে মুক্ত হলাম।

 

এদিন বাঁশবাড়িয়া ফেরীঘাটে সকাল আটটায় সরকারের নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম শাখাওয়াত হোসেন বিআরটিসি বাস টার্মিনাল উদ্বোধন করেন। এরপর ৬ উপদেষ্টাসহ প্রথম যাত্রী হিসেবে ফেরীতে ওঠে সন্দ্বীপে রওয়ানা দেন।

সন্দ্বীপের বাসিন্দা মো. জুয়েল বলেন, জন্ম থেকে সন্দ্বীপের প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই মধ্যযুগীয় কায়দায় পারাপার হয়ে আসছে। যা বলার ভাষা নেই। আজ একটি ঐতিহাসিক দিন আমাদের জন্য। আমরা কখনও কল্পনাও করতে পারিনি গাড়ি নিয়ে সন্দ্বীপে যাব। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলো।

ওই উপজেলার মাইটভাঙা ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী তানিয়া আফরোজ এতোদিন কুমিরা ঘাট হয়ে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যেতেন। কিন্তু সোমবার ফেরীতে চড়ে সন্দ্বীপ যাবেন বলে বাঁশবাড়িয়া ঘাটে এসেছেন। শাহাদাত বলেন, আমাদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত খুশির খবর। এই ঈদে সবাই আনন্দে ভোগান্তি ছাড়াই বাড়ি যাবেন এর চেয়ে খুশির আর কি হতে পারে।

তানিয়া আফরোজ বলেন, আবহাওয়া খারাপ হলে আমরা বাড়ি যেতে পারতাম না। মা, বাবা অসুস্থ হলে এখনি চলে যাব মাকে দেখতে সেটি হতো। অনেকের এমন হয়েছে সন্তান বাড়ি যাওয়ার আগে মা, বাবা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন।

সারিকাইত ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা কাদা মাটি মাড়িয়ে আসতাম নদীর পাড়ে। আমাদের কষ্টের কোন সীমা ছিলো না। এই সরকারকে ধন্যবাদ দিতে চাই তারা এটি করল সন্দ্বীপবাসী তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এখন থেকে আমরা ফেরীতে যাব, গায়ে কোন কাদা লাগবে না, পানি লাগবে না। ভোগান্তিও হবে না।

সুবর্ণচরের বাসিন্দা আব্দুর রহমান লিটন বলেন, সন্দ্বীপে ফেরী চলাচল শুরু হওয়ায় সুবর্ণচর ও উড়িরচরে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেননা এই অঞ্চলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। মানুষ সহজে চট্টগ্রামের খাতুনগেঞ্জ থেকে পণ্য নিয়ে সন্দ্বীপ হয়ে চলে যেতে পারবে। এছাড়াও আগামীতে সুবর্ণচর ও উড়িরচরের সাথে সড়ক করা হচ্ছে। এতে আর সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।

 

সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা মো. মাহমুদুল্লাহ বলেন, আমাদের অনেকের আত্মীয় রয়েছে ওপারে। তারা যেমন আমাদের দেখতে আসতে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়, তেমনি আমরা যেতেও। এবার ফেরী চালু হওয়ায় আমরাও আনন্দিত। প্রিয়জনদের মুখ দেখতে এখন আর যন্ত্রণা পোহাতে হবে না।

 

সন্দ্বীপের সাংবাদিক রিমন আল ফাহাদ বলেন, প্রায় সময় উপজেলার মানুষের দুঃখ, দুর্দশা নিয়ে কলম ধরতে হতো। এই বিষয়ে লিখেই শেষ করা যেতো না। এতো ভোগান্তি কোথাও আছে বলে আমার মনে হয়না। আমরা চাইতাম এ বিষয়ে যেন কখনও লিখা না লাগে। আজ সেটিই হলো। বিশেষ করে খনিজ সম্পদ ও জ্বালানী উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানকে ধন্যবাদ দিতে চাই তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টার ফলে দ্বীপবাসী আজ এই সুফল পাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এখানে দরকার কোষ্টাল ফেরী। এই মোহনার পানির জন্য ফেরীটি উপযুক্ত নয়। এটা মিঠা পানির ফেরী। এখানে ফেরী টেকাতে শক্ত মনিটরিং দরকার। বিশেষ করে নিয়মিত ড্রেজিং চালু রাখা। এছাড়াও যদি কোন কারণে ফেরী চলাচল বন্ধ হয়ে যায় তাহলে এখানে কুমিরা থেকে আইভি রহমান জাহাজটি স্থানান্তর করলেও মানুষ ব্যাপক সুবিধা পাবে।  তবে মাটি বিক্রি, টোল, মালামালের ভাড়া থেকে পাওয়া আয় থেকে ড্রেজিংয়ের খরচ ওঠে আসবে বলে করেন তিনি।

 

এই জনপদের আরেক সাংবাদিক ইশতিয়াক আহম্মেদ মেহরাজ বলেন, সন্দ্বীপ উপজেলা অতিতের সব সরকারের কাছেই অবহেলিত ছিল। অথচ রেমিট্যান্সে এই দ্বীপের মানুষের অবদান দেশে দ্বিতীয়। স্প্রীড বোট মালিক, আর বিআইডব্লিউটিএ, জেলা পরিষদ এর অসাধুদের সাথে মিলেমিশে টাকার লোভে মানুষের প্রাণ নিয়ে ব্যবসা করতো একটা শ্রেণি। আগে ৪০০ টাকা টিকিট ছিল, এখন কিভাবে সেটও ২৫০ টাকা হলো? এখানে অনেকেই চায় না ফেরী হোক। কারণ তাদের সিন্ডিকেট ভেঙে গেছে। তিনি আরও বলেন, ফেরীকে টেকসই করতে হলে এখানে লোভের থাবা থামাতে হবে। যারা মানুষের যাত্রা অনিরাপদ করে তুলতে চাইবে তাদেরকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আমি রেলপথ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা, আমাদের এলাকার কৃতি সন্তান ফাওজুল কবির খানকে ধন্যবাদ জানাই।

নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন, “সন্দ্বীপ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। এর সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। এতদিন এখানে যোগাযোগে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা অন্যায়। আজ ফেরি চলাচল শুরু হলো। তবে এটা কন্টিনিউ করতে কিছু সমস্যা আছে। এখানে যে চ্যানেল তা নিয়মিত ড্রেজিং করতে হয়; বছর বছর ড্রেজিং প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বর্ষায় এই পথে সি ট্রাক চলাচল করানো হবে। বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান বলেছেন, তারা সি ট্রাক দিবেন। কিন্তু সি ট্রাকে এত মালামাল বা গাড়ি নেওয়া সম্ভব হবে না। এখানে কোস্টাল ফেরি প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে কোস্টাল ফেরির প্রভিশন নেই। এটা আমাদের আনতে হবে। আপনাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”

সন্দ্বীপের সন্তান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “নৌপরিবহন উপদেষ্টা ও বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান এই কঠিন কাজকে সফল করেছেন। তারা এই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। কঠিন কাজ বলেই এতদিন হয়নি। তবে এটা এখনো চলমান কাজ। সারা বছর যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হলে কোস্টাল ফেরি লাগবে।

Tags :

সর্বশেষ