চট্টগ্রাম বুলেটিন

বাঘাইছড়িতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে নিম্মাঞ্চল, গ্রামবাসীর ভোগান্তি চরমে

পানিতে তলিয়ে গেছে কাচালং উচ্চ বিদ্যালয়

টানা বৃষ্টিতে ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, স্কুল-কলেজসহ রাস্তাঘাট। এতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান, পরীক্ষাসহ যাবতীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দূর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষেরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের কাচালং বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা কাপড় ভিজিয়ে হাঁটু পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছেন। এতে বিদ্যালয়টি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় বিদ্যালয়টিতে পাঠদানসহ যাবতীয় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী এবং ৩৩০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, লাল মিয়ার বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত রাস্তাটি টানা গত ৭-৮ দিন ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এতে ১০ম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষাও স্থগিত হয়েছে। যা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। শুধু ওই বিদ্যালয় নয়, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বাঘাইছড়ি উপজেলার আরও বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জানানো হলে সংস্কারের জন্য আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো দপ্তর থেকে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যালয়ে প্রবেশের রাস্তাটি লাল মিয়ার বাড়ি থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত কমপক্ষে তিন ফুট উঁচু করে সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করা হোক। যাতে সারা বছর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়।

স্থানীয় জরিনা বেগম বলেন, প্রতিবছর বর্ষায় পানি বাড়লে বিদ্যালয়টি ডুবে যায়। এতে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের কোমর সমান পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এবার পুরো বিদ্যালয়টি হাঁটু পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে।

একই এলাকার আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, প্রতিবছর বাঘাইছড়িতে ৩ থেকে ৪ বার বন্যা হয়; কিন্তু সমাধানের কোনো পদক্ষেপ নেয় না প্রশাসন। এর আগে বিদ্যালয়টি বন্যার্তদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খোলা ছিল। এখন সেটি পানিতে ডুবে গেছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুল হামিদ বলেন, “এ বিদ্যালয়ে শুধু বাঘাইছড়ি পৌর এলাকা নয়, পুরো উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করছে। প্রতিবছর বর্ষায় লাল মিয়ার বাড়ি থেকে স্কুল মাঠ পর্যন্ত রাস্তাটি হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। এবার টানা ৭-৮ দিন ধরে রাস্তাটি ডুবে আছে। গত বছরও আমরা বিষয়টি রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি। কিন্তু এখনও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিদ্যালয়টি প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার টাকা পৌর কর পরিশোধ করে। অথচ শিক্ষার্থীরদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। এভাবে দীর্ঘদিন চললে শিক্ষার মান ও পরিবেশের চরমভাবে ক্ষতি হবে।”

আরেক সহকারী শিক্ষক লোকবল তালুকদার বলেন, “শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে আসতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরাও আসতে পারছে না। এতে শুধু পাঠদান বন্ধ হচ্ছে না, পরীক্ষাও নেওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসে সময় নষ্ট করছে। এভাবে চললে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হবে। শুধু পড়াশোনা নয়, মানসিক চাপও বেড়ে যায়। আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

দশম শ্রেণির ছাত্রী ভূমিকা চাকমা বলেন, “প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা পড়াশোনায় অনেক পিছিয়ে যাচ্ছি। স্কুলে আসা যায় না, বাড়িতে বসে পড়াশোনা করা কঠিন। দ্রুত রাস্তাটি সংস্থার করে উঁচু করা হোক।”

নবম শ্রেণির ছাত্রী নওরীন জাহান রিয়া বলেন, “প্রতিদিন স্কুলে আসা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। বর্ষাকালে পানি ডিঙিয়ে আসতে গিয়ে বিপদের মুখে পড়তে হয়। এখন পুরো রাস্তা পানির নিচে। এতে পড়াশোনার ক্ষতি ছাড়াও ছাত্রীদের নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে রয়েছে।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভদ্রসেন চাকমা জানান, নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এমনকি চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাও স্থগিত করতে হয়েছে। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য আমরা প্রশাসন ও শিক্ষা বোর্ডের কাছে আবেদন করেছি। দ্রুত সমাধান না হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

 

 

Tags :

সর্বশেষ