চট্টগ্রাম বুলেটিন

সীতাকুণ্ডে ছোট্ট শিশু ইরা হত্যাকাণ্ড নিয়ে যা জানা গেল

বাবাকে থানায় হয়রানির অভিযোগ

এলাকায় শোকের ছায়া

বুলেটিন প্রতিবেদক:

সাত বছর বয়সী ছোট্ট শিশু জান্নাতুল নাঈমা ইরা। পড়তো দ্বিতীয় শ্রেণিতে। খেলাধূলা, বন্ধুদের সাথে হাসিখুশী সময় আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া, দাদীর হাতে দুধ ভাত ও চাচার হাতে আইসক্রিম খাওয়া। এই ছিলো বাবা-মায়ের আদরের চঞ্চল ইরার আনন্দময় শৈশব। কিন্তু হঠাৎ কোমলমতি সেই জীবন শিকার হলো নরপশুদের ভয়াবহ নৃশংসতার। বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরের দাদার বাড়িতে খেলতে যাওয়ার পথে অপহরণের শিকার হয় ইরা। সেখান থেকে নরপশুরা ইরাকে নিয়ে যায় ১২৫০  ফুট উচ্চতার সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ার একটি জঙ্গলে। পাশবিক নির্যাতন শেষে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালানো হয় তাকে। নরপশুদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে গলাকাটা অবস্থায় হেটে জঙ্গল থেকে বের হয় ইরা। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে সোমবার ভোর রাত রাতে হাসপাতালের বেডেই নিভে যায় ছোট্ট ইরার জীবন প্রদীপ। তার মৃত্যুতে সীতাকুণ্ডের কুমিরার মসজিদ্দা গ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠেছে। মেয়েকে হারিয়ে মঙ্গরবার দুপুরে চমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে আহাজারি করছিলেন বাবা মনিরুল ইসলাম। মা রোকেয়া বেগমও বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। নিহত ইরার বাবার একজন অটোরিকশা চালক ও মা গৃহীনি। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে ইরা দ্বিতীয়।

পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যে মূলহোতা বাবু শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছড়িয়ে পড়ে একটি ভিডিও দেখে তাকে সনাক্ত করে পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান জানান, আসামি বাবু শেখ ইরার প্রতিবেশী। দুদিন আগে ইরার মার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল তার। গত রোববার ইরা খেলতে বাইরে বের হলে চকলেটের কথা বলে ফুসলিয়ে ইরাকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে নিয়ে যায় বাবু শেখ। পরে সেখানে নিয়ে তাকে ছুরি কাকাত করে হত্যা করে। এ ঘটনায় রক্তমাখা জামা চকলেট ও ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। আসামিকে হত্যা মামলায় আদালতে পাঠানো হবে।

 

এদিকে ইরার পরিবারকে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরের ধর্ষণে আলামত মিলেছে। যেই পার্ক থেকে তাকে উদ্বার করা হয় সেই পার্কের প্রবেশ গেট দিয়েও হত্যাকারী বাবু শেখ প্রবেশ করেনি। সে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সীতার মন্দির সংলগ্ন দুই নম্বর পুল ব্যবহার করে উপরে উঠে। পরে গহীন জঙ্গলে ইরাকে হত্যা করে।

চমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, সোমবার রাত তিনটার দিকে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ইরা মারা যায়। তার আগে  মধ্য রাতেও ইরা সবার সাথে ইশারায় কথা বলেছিল। কিন্তু শ্বাসনালী প্রায় চার ইঞ্চি কাটা হওয়ায় তার কথা কোনভাবেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল না।

জানা যায়, গত ১ মার্চ রোববার সকাল আটটায় সকালের নাস্তা শেষে প্রতিদিনের মতো কুমিরা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মসজিদ্দা গ্রামের বাসা থেকে বেরিয়ে পাশ্ববর্তী দাদার বাড়িতে খেলতে যাচ্ছিল ইরা। প্রতিদিন সকালেই নিজের বাসা থেকে দাদার বাড়িতে যায় ইরা। সেখানেই অন্য চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে দিনভর খেলা করতো ইরা।

যাওয়ার পথেই তাকে অপহরণ করা হয়। দুপুর ১২টার দিকে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়া যা বোটানিক্যাল গার্ড়েন ও ইকোপার্কের শেষ প্রান্ত থেকে তাকে উদ্বার করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিশু ইরা রক্তাক্ত অবস্থায় পায়ে হেঁটে আসছিল। ইকোপার্কে সড়ক মেরামতের কাজ চলছিল তখন। শ্রমিকদের কাছে এসে কিছু একটা বলার চেষ্টা ছিল ইরার। কিন্তু আহত হওয়ায় তার কথা বুঝা যায়নি। পরে শ্রমিকরা থানায় অবগত করে গলায় গামছা পেছিয়ে একটি পিকআপে করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে। সেখানে চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে চমেক হাসপাতালে রেফার করে।

ইরার চাচা মো. রমিজ আলী জানান, আমরা দুপুর দুইটায় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেখতে পাই আমার ভাতিজির রক্তাক্ত দেহের একটি ছবি ভাসছে। সেখানে একটি নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হলে কল দিয়ে সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাই। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেলে তাকে দুদিন অপারেশন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তাকে বাঁচানো যায়নি। এছাড়াও তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আরো ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, আমার ভাতিজিকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে আলামত মিলেছে। চিকিৎসকরা আমাদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তার সাথে যে এমন জঘন্য কাজ করেছে আমরা তাদের বিচার চাই।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শিশুটি কুমিরা ৫১ নং মসজিদ্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো। তার বাবা অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। তার দাদার বাড়ি ওই ইউনিয়নের মসজিদ্দায়। কিন্তু কয়েক মাস আগে যৌথ পরিবার থেকে পৃথক হয়ে তার বাবা একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। কিন্তু শিশু ইরা সবসময় দাদার বাসায় যাতায়াত করতো। দাদী ও চাচাদের আদরে বড় হতো ইরা। কখনও গেলে আসতেই চাইতো না ইরা। দিনের বেশিরভাগ সময় দাদার বাড়িতে চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে কাটাতো সে। রোববার সকালে দাদার বাড়ির উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ইরা। শিশুটির মা ভেবেছিল দাদার বাড়িতে চলে গেছে। কিন্তু দুপুরে তারা ফেসবুকের মাধ্যমে মেয়ের দু:সংবাদ পায়।

মঙ্গলবার দুপুরে চমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে দেখা যায়, ইরার বাবা মনিরুল ইসলাম মেয়েকে হারিয়ে আহাজারি করছেন। মা রোকেয়া বেগমও বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। ছোট্ট সন্তানকে এভাবে হারাবেন কারা কখনও ভাবেনি। বাবা মনিরুল ইসলাম কান্নাজনিত কণ্ঠে বলেন, আমার ছোট্ট মেয়েটির কি দোষ ছিল? তাকে কেন এমন করতে হলো। এসময় তার মাকে বাকরুদ্ধ অবস্থায় দেখা গেছে।

বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের পর্যটন ও পুনর্বাসন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, আমাদের আট জন প্রহরী ছিল। কিন্তু যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে কেউ ছিল না। সেটি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ার কিছুটা নিচে। এলাকাটি আমাদের আওতাভুক্ত নয়, চন্দ্রনাথ মন্দিরের দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির আওতাভুক্ত।

ইকোপার্কের ইজারাদার মো. নাছির উদ্দিন জানান, ১ মার্চ ঘটনার দিন কেউ শিশু নিয়ে প্রবেশ করেনি। আমরা সব সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশকে দিয়েছি। তারা অন্য কোন পথে প্রবেশ করতে পারে। এদিকে শিশুটিকে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় শিশুটির বাবা মনিরুল ইসলামকে আটক করে হয়রানি করার অভিযোগ ওঠেছে। শিশু ইরার চাচা রমিজ আলী জানান, একটি টেলিভিশনের অনলাইন ভার্সনে ভিত্তিহীন, মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের জেরে আমার ভাইকে হয়রানি করা হয়। যেখানে তিনি মেয়েকে হারিয়ে শোকাহত। সেখানে পুলিশ উল্টো তাকে হয়রানি করেছে। প্রায় ৫-৬ ঘন্টা থানায় তাকে সন্দেহ করে আটক রাখা হয়। কিন্তু পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

 

সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি সর্বচ্চো গুরুত্ত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ইকো পার্ক ও আশপাশের সবকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেখানে কাউকে শিশুটিকে নিয়ে পাহাড়ে ওঠার ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে পাহাড়ের সবখানে সিটি ক্যামেরা নেই। ক্যামেরা আওতাধিন এলাকা এড়িয়ে শিশুটিকে ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সবগুলো বিষয় পর্যালোচনা করে তদন্তকাজ চলছে। কিন্তু এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। শিশুটির বাবাকে হয়রানীর বিষয়ে ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সেই সব তথ্য যাচায় বাছায় করতেই শিশুটির বাবাকে থানায় আনা হয়েছিলো। কিন্তু তাকে কোন হয়রানী করা হয়নি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন জানান, দুই দিন চিকিৎসাধিন থাকার পর মঙ্গলবার ভোর রাতে শিশুটি মারা গেছে। হাসপাতালে ভর্তি হবার পর থেকে তার অবস্থা গুরুতর থাকায় ধর্ষনের বিষয়টি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে  আমরা শিশুটির স্যাম্পল সংগ্রহ করে রেখেছি। এখন বাকি পরীক্ষা নিরিক্ষাগুলো করা হবে। রিপোর্টগুলো এলে ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

Tags :

সর্বশেষ