চট্টগ্রাম বুলেটিন

অর্থমন্ত্রীকে আদালতের এজলাসে ঢুকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা সেই ওসি মহসীন ধরাছোঁয়ার বাইরে

ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতাকর্মীরা

বিএনপি সরকারের বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে স্বৈরাচারী আমলে চট্টগ্রামের একটি আদালতের এজলাসে অস্ত্র হাতে প্রবেশ করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়েছিল তথা কথিত মানবিক ওসি কুখ্যাত আওয়ামী পুলিশ লীগের হোতা মোহাম্মদ মহসীন৷ অথচ ছাত্রজনতার বিপ্লবের দুই বছর হতে চললেও সেই মহসীন আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতে ক্ষুব্ধ চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাকর্মীরা। তাদের কেউ কেউ এটিকে দলের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। অনেকের দাবি, মহসীনসহ যতো ওসি, এসআই বিএনপি নেতাকর্মীদের হাত-পা ভেঙে দেওয়াসহ বহু জুলুম চালিয়েছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। তাহলেই মজলুম নেতাকর্মীরা শান্তনা পাবে।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে পদায়িত হলে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত কোতোয়ালির ওসি ছিলেন আওয়ামী ক্যাডার মহসীন৷ ২০২১ সালের দিকে চট্টগ্রাম মহানগর জজ আদালতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একটি মামলার হাজিরা দিতে গেলে মহসীন হাসিনাকে খুশি করতে আদালতের এজলাসে ঢুকে পড়ে অস্ত্র হাতে। সেদিন বিচারক ছিলেন নিশ্চুপ। ওই ঘটনা তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে ঝড় ওঠেনি। তবে সকলকে হতবাক করেছিল মহসীনের বেআইনী ওই আগ্রাসী ভূমিকা। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার উপস্থিতিতে তৎকালীন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিনের অস্ত্রসহ এজলাসে প্রবেশের ঘটনাটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন এবং বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে তখন থেকে।

বাংলাদেশের আইন ও উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, এজলাস বা আদালত কক্ষের ভেতরে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা সাধারণ পোশাকে বা ইউনিফর্মে থাকলেও অস্ত্রসহ প্রবেশ করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ এবং এটি আদালতের পবিত্রতা ও বিচারকের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। বিদ্যমান ‘পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল’ (PRB) এবং সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, আদালতের ভেতরে কোনো বিচারপ্রার্থী বা অভিযুক্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব হলেও বিচারকের খাস কামরা বা এজলাসে সরাসরি অস্ত্র প্রদর্শন বা অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিককে আদালতের এজলাস থেকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা কেবল আইনি শিষ্টাচার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।

সচেতন সমাজ এবং আইনজ্ঞদের মতে, বিচারকের আসন যেখানে সর্বোচ্চ সম্মানের এবং যেখানে একজন নাগরিক ন্যায়বিচারের আশায় আসেন, সেখানে পুলিশের এমন আক্রমণাত্মক ভঙ্গি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে গেল ১৭ বছর এই বাহিনীর প্রতি আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। যা আজও ফিরেনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো একজন ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এমন বলপ্রয়োগের ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন বলে মনে করেন দলীয় নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে, এই ঘটনার মূল কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত সেই পুলিশ কর্মকর্তা মহসিন বর্তমানে কোথায় আছেন বা কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হয়নি, তা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও কৌতূহল রয়েছে।

উত্তর জেলা বিএনপি নেতা প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা থাকলেও ক্ষমতা ও প্রভাবের ছত্রছায়ায় অনেক সময় বির্তকিত কর্মকর্তারা পার পেয়ে যান, যা আইনের শাসনের অন্তরায়। সাধারণ জনতার দাবি হচ্ছে, বিচারালয়ের পবিত্রতা নষ্টকারী এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অতিদ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এমন ঔদ্ধত্য দেখানোর সাহস না পায়। আদালতের ডাইসে থাকা বিচারক ও সেখানে উপস্থিত আইনজীবীরা প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হয়তো তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় এবং বর্তমান স্বাধীন প্রেক্ষাপটে এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হওয়া আজ সময়ের দাবি। তিনি আরও বলেন, দেশের আম জনতা আশা করে যে, বৈষম্যহীন বাংলাদেশে আইনের ব্যত্যয় ঘটানো এমন কর্মকর্তাদের অবস্থান প্রকাশ্যে আনা হবে এবং তাদের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। তাছাড়া বিএনপি নেতা মাবুদ ভাইকে সে হত্যা করেছে। তার হাত বিএনপি কর্মীদের রক্তে লাল হয়ে আছে। আমি তাকে দেখতে চাই, কেন সে এমন পোষা কুকুরের ভূমিকায় ছিল তখন তাকে একটাবার সরাসরি প্রশ্ন করতে চাই৷ আইন হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে আমি নয়, তবে আইনের শাসন এখন যে প্রতিষ্ঠিত হলো সেটা থেকে সে যেন রেহাই না পায়৷ মহসীনরা পুলিশ ও জাতির কলঙ্ক।

Tags :

সর্বশেষ