চট্টগ্রাম বুলেটিন

চমেক হাসপাতাল: একমাত্র এমআরআই মেশিনটি নষ্ট চার বছর, ভোগান্তির অবসান হচ্ছে আগামী সপ্তাহে

দুই হাজার শয্যার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চট্টগ্রাম বিভাগের চার কোটি মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল। অথচ এখানে গেল চার বছর ধরেই অচল হয়ে পড়ে আছে ১০ কোটি টাকা মূল্যের একমাত্র এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) মেশিনটি। এতে দীর্ঘ সময় ধরে জটিল শারীরিক সমস্যার পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম খরচে হাসপাতালে করতে পারছেন না বহু রোগী। তবে এমআরআই মেশিন অচল থাকার দিন শেষ হতে চলেছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আগামী সপ্তাহেই মেশিন পূর্ণদমে পরীক্ষা করতে সক্ষম হবে বলে জানা গেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ু, টিউমার, স্ট্রোকসহ শরীরের বিভিন্ন অংশের সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য এমআরআইয়ের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালে এমআরআই মেশিন সচল থাকলে দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগ নির্ণয় করে রোগীদের দ্রুত সেবা দেয়া সম্ভব হয়। তবে এখন একমাত্র এমআরআই মেশিনটি অসচল থাকায় আমাদের রোগীরা সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

দীর্ঘ চার বছর ধরে চমেক হাসপাতালে আসা গরীব, অসহায় রোগীদের বাইরের হাসপাতালে ৮-১৫ হাজার টাকায় এমআরআই করাতে হচ্ছে। এই চমেক হাসপাতালে প্রতিদিন নগরের ৪১টি ওয়ার্ড ও জেলার ১৫টি উপজেলা থেকে এখানে জটিল, আধা জটিল রোগের চিকিৎসা নিতে এসে বিভিন্ন ওয়ার্ডের বেডগুলোতে ভর্তি থাকেন সাড়ে তিন হাজার রোগী। এছাড়াও বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নেন অন্তত তিন হাজার রোগী। সেই হিসেবে মাসে বর্হিবিভাগে এক লাখ মানুষ চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অনেক রোগীকেই প্রেসক্রিপশনে এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) পরীক্ষাটি দিয়ে থাকেন। যা বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এজন্য গরীব রোগীরা সরকারি হাসপাতালেই ভরসা করেন। কিন্তু এমআরআই যন্ত্র নষ্ট থাকায় গত ৪৮ মাস ধরে সেই ভরসা করা যাচ্ছেনা।

এতে ভোগান্তির পাশাপাশি জটিল রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে ঋণগ্রস্তও হচ্ছেন অনেক রোগী। কেউবা সামর্থে না পেরে শেষমেষ হালই ছেড়ে দিচ্ছেন রোগ মুক্তির। যদিও অভিযোগ আছে, বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যবসা চাঙ্গা রাখতেই ইচ্ছেকৃতভাবে এমআরআই মেশিনটি বছরের পর বছর নষ্ট করে রাখা হয়। আর এর সাথে জড়িত হাসপাতালেরই একটি দুষ্ট চক্র। এমন অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।

সরেজমিনে গত ৮ এপ্রিল চমেক হাসপাতালে গিয়ে নিচ তলায় রেডিওলোজি এণ্ড ইমেজিং বিভাগের কক্ষটি বন্ধ পাওয়া গেছে। অপরদিকে জরুরী বিভাগ ও বর্হিবিভাগের কাউন্টারের কর্মীরাও রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন এনআরআই নেই জানিয়ে। এসময় কথা হয়, আনোয়ার হোসেনের সাথে। যিনি গত ৪ মাস আগে সড়ক দূর্ঘটনায় হাত ও পায়ে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন। জেলার মিরসরাই থেকে তিনি এসেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমআরআই করাবেন বলে। কিন্তু তিনি পঞ্চম বারের মতো ফিরে যাচ্ছেন মেশিনটি নষ্ট বলে। তিনি হতাশার সুরে বলেন, আমি কয়েক দফায় এসেও সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষাটি করাতে পারিনি। ডাক্তার আমাকে এই পরীক্ষাটি করিয়ে তারপর দেখা করতে বলেছেন। আমার সু্স্থ হয়ে ওঠা বোধহয় আর হবে না।

শুধু আনোয়ার হোসেন নয় ৮ এপ্রিল দুপুরে অনেকেই এমআরআই করতে না পেরে ফেরত চলে যেতে দেখা যায় চমেক হাসপাতাল থেকে। রিকশাচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, তার ছেলে টিউমারের সমস্যায় ভুগছেন আট মাস ধরে। এমআরআই বাইরে করাতে ৮-১৫ হাজার টাকা লাগে। সেই টাকা যোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারিতে বারবার আসলেও সেটি বন্ধ পাচ্ছেন তিনি।

একই কথা বলেন, তলপেটের ব্যথায় ভুগতে থাকা সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা মোছাম্মৎ মরিয়ম আক্তার। তিনি ফেনী থেকে আসেন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। চিকিৎসক এমআরআই করাতে দিলে তিনিও করাতে পারেননি। হাসপাতালে করানো যায় না এমআরআই আর এই সুযোগে বাইরের হাসপাতালগুলো চড়া দাম ধরে বসে থাকেন বলে অভিযোগ করেন এই নারী।

মুঠোফোনে খবরের কাগজকে সন্দ্বীপের বাসিন্দা মিয়া হানিফ বলেন, হাঁটুর গোড়ালি, কব্জি, মাংসপেশীর ব্যাথায় ভুগছিলেন। চিকিৎসক তাকে এমআরআই লিখে দেন। তাকে ঋণও করতে হয়েছে শুধুমাত্র এমআরআই করাতে। সেই ঋণ এখনও টানছেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, চমেক হাসপাতালের অসাধু কর্মচারীরাই ওই মেশিনটি নষ্ট করে দেয়। তা না হলে বাইরের ব্যবসা চলবে কি করে?

হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগী মিজান হোসেন বলেন, মেরুদণ্ডের আঘাতে ভুগছেন তিনি। অন্যান্য সব পরীক্ষা করালেও একটি পরীক্ষায় তার চিকিৎসা আটকে আছে। কোথায় এমআরআই তা জানতেও তাকে হাঁফিয়ে ওঠতে হয়েছে। কিন্তু গিয়ে দেখেন এমআরআই এখানে হয়না। তিনি দ্রুত মেশিনটি চালু করার দাবি জানান।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রায় ১০ কোটি টাকার জাপানি হিটাচি ব্র্যান্ডের (১.৫ টেসলা) এমআরআই মেশিন চমেক হাসপাতালে যুক্ত করে। ৩ বছরের ওয়ারেন্টিতে মেশিনটি সরবরাহ করে ঢাকার মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেড। ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের নিচতলায় এটি স্থাপন করা হয়। ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল কার্যক্রম শুরু হলেও ৩ বছরের আগেই এটিই নষ্ট হয়ে যায়। ২০২০ সালের অক্টোবরে পুরোপুরি অচল হয়ে প্রায় ৭ মাস এটি বন্ধ থাকে। এরপর আবেদনে প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের মে মাসে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এটি মেরামত করে দেয়। এরপর শুরু হয় পরীক্ষা। তবে আবারও ১ মাসের মাথায় সেটি নষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে আর মেরামত করা হয়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নতুন মেশিন কিনতে লাগবে ১৮ কোটি টাকা। আর নষ্ট মেশিন মেরামত করতে লাগবে ৭ কোটি টাকা। অন্তত ৪০ বার চিঠি চালাচালি হয়েছে মেশিনটি ঠিক করতে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। শেষবার সাড়া পেয়েছে চমেক

হাসপাতালের স্টাফদের ইনচার্জ সাদেকুর রহমান চৌধুরী শনিবার খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিদিন ১৫-২০ জন রোগী আসেন এমআরআই করাতে।বর্তমানে এটির মেরামতে কাজ চলমান। প্রকৌশলীরা কাজ বুঝিয়ে দিলে চালু হবে। আশা করা হচ্ছে আগামী সপ্তাহে চালু করা যাবে।

রোগীদের এমআরআই করাতে না পারার দু:খ ঘুচছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার মো. তসলিম উদ্দিন জানান, শীঘ্রই এমআরআই মেশিন চালু হবে বলে আশা করা যায়। এটি ৭ কোটি টাকা সরকারি খরচে মেরামত করা হচ্ছে দ্রুত সময়ে। আগামী সপ্তাহেই এই সেবা পেতে শুরু করবে মানুষ।

এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের নিমিউ এন্ড টিসি এর টেকনিক্যাল ম্যানেজার (রিপেয়ার) ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এটি মেরামতের আওতায় রয়েছে। কাজ শেষ হলেই রোগীরা সেবা পাবেন। তবে মেরামতে ঠিক কতদিন লাগবে জানতে চাইলে তিনি জানাতে পারেননি।

 

সূত্র: খবরের কাগজ

 

Tags :

সর্বশেষ