নিজাম হাজারীর ক্যাডার বাহিনীর গুলিতে নিভে যায় মাছুমের জীবন প্রদীপ
আমার ভাই ছিল আমাদের কলিজার ধন। ব্যবসা, পারিবারিক কাজ, মায়ের চিকিৎসা সব কিছুই সে দেখাশোনা করতো। মা ডায়বেটিসে আক্রান্ত দীর্ঘদিন। মায়ের কখন কি ওষুধ খেতে হয় সবই তার মুখস্থ। আমি আগলে রাখতাম তাকে। আর সে আগলে রাখতো আমার আড়াই বছরের সন্তানকে। তাকে হারিয়ে আমি একপ্রকার অচল। মা বাকরুদ্ধ আর আমার ছোট শিশু সন্তান সঙ্গী হারা, আদর বঞ্চিত। কান্নাজনিত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, জুলাই আন্দোলনে নিহত শহীদ মাহবুবুল হাসান মাছুমের (২৫) এর বড় ভাই মাহমুদুল হাসান।
মাষ্টার্সে অধ্যয়নরত মাহবুবুল হাসানের স্বপ্ন ছিলো বড় ব্যবসায়ী হওয়ার। দেশের বেকারত্ব ঘুছতে তার চিন্তা ছিল চাকরী করবেন না, চাকরী তিনি দেবেন। নিজের কষ্টের টাকায় ফেনী শহরে একটি দোকানও নেন তিনি। চেয়েছিলেন একটি কোম্পানী গড়ে তুলতে। কিন্তু সেই দোকান আর উদ্বোধন করা হলোনা। গেল বছরের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে ছাত্র জনতার আন্দোলনে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারীর ক্যাডার বাহিনী গুলি চালালে মাহবুবুল হাসান মাছুমের মাথায় তিনটি গুলি লাগে। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে ৭ আগস্ট দুপুরে মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গুলির আঘাতে তার মাথার মগজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ব্যাপক রক্তক্ষরণ হয়ে তিনি মারা গেছেন।
তার মৃত্যুর পর থেকে মাছুমের মা, ভাই, বোন, ভাবী, ভাতিজাসহ পুরো পরিবার তার শোকে বিহব্বল। বছর ঘুরে এসেছে সেই জুলাই যেই জুলাইয়ে তাদের স্বজন প্রাণ দিয়েছেন। এখনও মাহবুবুলের মা চোখের জলে জায়নামাজ ভেজান। অন্যরা তাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবুও থামেনা তার কান্না, সন্তানের জন্য আহাজারি।
চট্টগ্রাম বুলেটিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা পুরো পরিবার জুলাইয়ে আন্দোলনে ছিলাম। একেক ভাই একেক স্থানে আন্দোলন করেছি। ৪ ভাইয়ের সবাই অনলাইনে লেখালেখি করি এবং সবাই রাজনীতিতে সক্রিয়। কিন্তু কখনও ভাবিনি দেশের জন্য আমাদের ভাই শহীদ হবে। মাহবুবুল হাসান ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, কর্মঠ। কখনও ফাঁকি দিতো না। আমাকে ব্যবসার সব কাজে সহযোগিতা করতো। একসময় তার সহযোগিতা ছাড়া আমি চলতেই পারছিলাম না। সবকিছুতে আমার তাকে লাগতো। আমি একটি চা পাতার কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করি। সেই কোম্পানীর অফিসের ডিজাইনও মাহবুবুলের করা। ২০২৩ সালে মাহবুবুল মাষ্টার্স অধ্যয়নকালেই নিজেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তার মধ্যে ব্যবসার ঝোঁক বেশি থাকায় আমি তাকে বলি আমার কোম্পানীর পণ্য নিয়ে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা অঞ্চলে ব্যবসার শাখা করতে। এরপর মাহবুবুল হাসান ফেনীতে ব্যবসা শুরু করে এবং সেখানে একটা ব্যাচেলর বাসায় থাকতো। কিন্তু জুলাইয়ে আমার ভাই আন্দোলনে নামে। ২১ জুলাইয়ের পর চট্টগ্রামে আমাদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ থেকে। তখন টালমাতাল অবস্থা দেশের। গ্রেপ্তার আতঙ্কে আমরা ভাইয়েরা সবাই বাড়ি ছাড়া। আমার ছেলে মিফতাহুলকে তার চাচা মাহবুবুল খুব আদর করতো। তারা একজন আরেজনের জন্য পাগলপারা ছিল। সেইই ছিল আমার ছেলের একমাত্র খেলার সঙ্গী।
৪ আগস্ট দুপুরে আমি বাসায় গেলাম সামান্য সময়ের জন্য। আমার স্ত্রী নামাজ পড়ার সময় হঠাৎ করেই আমার ছেলে বারবার কান্না করছে। কোনভাবেই শান্ত করা যাচ্ছিল না তাকে। আমি আঁচ করলাম কোন বিপদ হয়েছে। এমন সময় আমি বাসা থেকে বিদায় নিয়ে পাশের বাসায় গিয়ে অবস্থান নিই। পুলিশ তখন গলিতে গলিণতে তল্লাশী করছে। অনেকবার কল করলাম কিন্তু মাহবুবুল কল রিসিভ করল না। ওইদিন দুপুর ১২টা ৫৬ মিনিটে কল রিসিভ করে বলল সে নামাজ পড়ে চলে যাচ্ছে বাসায়। আমি তাকে বললাম তুমি বাসায় যাও। এর ২ মিনিট পর আবারও কল দিলাম। কিন্তু রিসিভ হলোনা। পরের বার অন্যজন ধরে বলল, মাহবুবুল হাসান নিজাম হাজারীর ক্যাডারদের গুলিতে বিদ্ধ হয়েছেন। মুহুর্তেই বাকরুদ্ধ হলাম। অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। অনেক চেষ্টা করেও ফেনীতে যেতে পারলাম না। গাড়ি নেই, ইন্টারনেই নেই। পথে পথে নিরাপত্তার ঝুঁকি। হাসপাতালে রোগী নেওয়ার অপরাধে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ২ জনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সেসময়। কেউ আমার ভাইকে এনে দিতে চাচ্ছিল না। পরে একজনকে বহু অনুরোধ করে তাকে আনা হলে প্রথমে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। ৩ দিন ধরে তার দেখাশোনা করলেও মাকে বলেছি সে মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করেছে। এর মধ্যে দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হলো। আমার ভাই তখন হাসপাতালের আইসিইউতে। ৭ আগস্ট দুপুরে সে আমাদের ছেড়ে চলে যায়।
হামজারবাগে প্রথম জানাযা শেষে ফেনীর সোনাগাজীর চরচান্দিয়ার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে দ্বিতীয় নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মাহবুবুল হাসান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি সোনাগাজী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে জিপিএ ৪.৫০ পেয়ে দাখিল পাশ করেন। আর চট্টগ্রাম দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে ৪.৭০ পেয়ে আলিম পাশ করেন। ফেনীর আব্দুল হক চৌধুরী কলেজে বাংলায় অনার্স শেষ করে তিনি মাষ্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন। তার জন্ম সোনাগাজীর চরচান্দিয়া ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তার বাবা হাফেজ নোমান হাসান ও দাদা ছিলেন মসজিদের ইমাম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে মাহবুবুল ছিলেন ষষ্ঠ।
মাহবুবুল হাসানের আরেক ভাই হাফেজ মনজুর হাসান বলেন, আমার ভাই ২৪ এর জুলাই মাসে একটি নতুন দোকান নেয় ফেনীতে। তার স্বপ্ন ছিল সেটি বড় করে উদ্বোধন করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন হলো না। আমরা দ্রুত জুলাই গণহত্যার বিচার চাই।
মাহমুদুল হাসান বলেন, আমার মায়ের কান্না থামেনা। ছেলের কথা মনে করে তিনি কিচ্ছু খান না। জায়নামাজে বসে সারাক্ষণ কান্না করতে থাকেন। রাতে ঘুমান না। তাকে থামাকে গিয়ে আমাদেরও চোখ ভিজে যায়। তার নেওয়া দোকানটি দেখতে যখন ফেনীতে গেলাম কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সারাদিন ঘুরে যখন পেলাম তখন দোকানের মালিক বলল মাহবুবুল দোকানের চুক্তি করে আর আসেনি, উদ্বোধনের দাওয়াত দিবেন বলেছেন, কিন্তু দেননি। তাকে আর দেখলামও না। জবাবে আমি বললাম আমার ভাইতো আন্দোলনে মারা গেছেন। তারাও কান্নাও আটকাতে পারলেন না। তিনি বলেন, শেখ হানিসাকে প্রধান আসামি করে ১৬২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কেউই গ্রেপ্তার হননি। জুলাই গণহত্যার বিচার না হলে আমাদের ভাইদের রক্তের সাথে বেঈমানী করা হবে।