ঘর থেকে বের হতে মাত্র ৩০ সেকেন্ড দেরি হলেই আগুনের ভয়াবহ দাবানলে পুড়ে মরতাম। প্রথমে নগদ টাকা, মোবাইল ও মানিব্যাগটা নিয়ে বের হওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। কিন্তু আগুনের উত্তাপ এতোই বেশি ছিল যে বিছানার উপর পড়ে থাকা মোবাইল ফোনটি নিয়েই কোনমতে প্রাণে বেঁচে আসি। আমি তখন অনেকটা অজ্ঞানের মতো ছিলাম। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। বের হয়েই মনে হলো যেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরলাম। আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া করলাম।
কথাগুলো বলছিলেন শনিবার (১৬ নভেম্বর) রাতে নগরের ইপিজেড এলাকার বন্দটিলা খালের আকমল আলী ঘাটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী মো. জাকির হোসেন। তিনি আরও বলেন, আমি একজন কর্মচারী। দোকানটিতে কাজ করতাম। ক্যাশ বাক্সে প্রায় দেড় লাখ টাকা ছিল সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার দোকানের মালিকরা এখনও জানে না তাদের দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কেননা তারা গতকাল সকালে সাগরে মাছ শিকারে গেছেন। আর ফিরে আসেননি। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত তখন বারোটা বাজার ১০ মিনিট বাকি। হঠাৎ চারিদিকে চেঁচামেচি। মানুষের আর্তনাদ। আমার ঘুম ভাঙল। আমি ঘুমন্ত অবস্থায় চোখ কচলাতে কচলাতেই বের হলাম। আমার ঘরটি থেকে আগুন অন্তত ৫০ মিটার দূরে। মাঝে একটি চলাচলের রাস্তা। আমি ঘর থেকে বের হয়ে আগুনের ভয়াবহতা দেখছিলাম মাত্র ১ মিনিট হলো। এরই মধ্যে আমার ঘরেও আগুন লেগে যায়। এরপর আমি আর সামনের দরজা দিয়ে ঢুকতেই পারিনি। পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকলাম টাকা পয়সা নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি ভাবতেও পারিনি আগুন মুহুর্তেই এতোটা ছড়িয়ে পড়বে।
মো. জাকির হোসেন বলেন, আমি ক্যাশবাক্সে থাকা টাকাগুলো ধরতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় গায়ে এসে আগুন পড়লো। কোনমতে মোবাইলটা নিয়ে বের হয়ে আসি। যেন আরও বিরাট বড় বিপদ থেকে প্রাণে বাঁচলাম। তিনি বলেন, আগুনের তাপ খুব বেশি ছিল। অনেক দূরে অবস্থান করেও দাঁড়াতে পারছিলাম না। গায়ে খুব তাপ লাগছিল। আজ সকালে এসে কিছু পোড়া কয়েন কুড়িয়ে নিই। ভাবলাম যেই আগুন আমাদের শেষ করে দিলো সেই আগুনের কিছু স্মৃতি রেখে দিই।
তবে কেবল জাকির হোসেন নয় রবিবার রাতের ভয়াবহ আগুনে পুড়েছে আকমল আলী ঘাট এলাকার ২ হাজারের বেশি পরিবারের স্বপ্ন। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঘাটে সাগর থেকে মাছ আহরণ করে নিয়ে আসে জেলেরা। এরপর সেই মাছ চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
জানা গেছে, এখানে ছিল ৪২ দোকানঘর। ৪টি হোটেল, কয়েকটি তেলের দোকান, কয়েকটি মুদি দোকান। আর বাকিগুলো জেলেদের জাল রাখার ঘর। রবিবার রাতে পৌনে বারোটায় একটি জালের ঘর থেকে আগুন লাগে। এরপর একটি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। পুরোটা ঘাটের সবকটি দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে জেলেদের কয়েকশ মাছ শিকারের জাল, অন্তত ১০টি মোটর ইঞ্জিন, তেলের ড্রাম অন্যান্য জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জেলেদের দাবি এই আগুনের ঘটনায় ১০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যা পুষিয়ে ওঠতে তাদেরকে ভুগতে হবে আগামী কয়েক বছর। সরকারি সহযোগিতা না পেলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। এছাড়াও উপার্জস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পড়েছেন ২ হাজার পরিবার।
মো. ফয়সাল বলেন, আমরা ধারণা করছি কয়েল থেকে চুলার পাশে আগুন লাগে, তা ছড়িয়ে পড়ে জালে। এরপর গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে বিকট শব্দ হয়। আমার জেঠার দোকানে জালের মধ্যে টাকা ছিল ৫০ টাকা। সেগুলো নিতে পারিনি। সবমিলিয়ে আমাদের ক্ষতি ১৫ লাখের মতো।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আলমগীর ও মাহবুব সওদাগর। তাদের দোকানে জালসহ যাবতীয় জিনিসপত্র ছিল। সবমিলিয়ে তারা দুজন ২০ লক্ষ টাকা করে ৪০ লক্ষ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, শনিবার রাতে আমি সাড়ে দশটায় দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে যাই। কিছুক্ষণ পরে খবর আসল আগুন লেগেছে। এসে দেখি কোন কিছুই হাতের নাগালে নেই। ধাউ ধাউ করে আগুন জ্বলছে। আমার মুদির দোকানে ক্ষতি হয়েছে ৩ লাখ টাকা। আমার ভাইয়ের জালের ঘরে ক্ষতি হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। তার কয়েকটি ইঞ্জিন মেশিন ছিল যেগুলো দিয়ে বোট চলে। প্রতিটির দাম ৩-৪ লাখ টাকা করে। একেকটি জাল ১৫-২০ হাজার দাম। তার দাবি আকমল আলী ঘাটে ১০ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু ক্যাশ বাক্সটা বের করেছি কোনমতে। আর কোন মালামাল আনতে পারিনি। সব মালামাল জ্বলে গেছে। আমরা এখন ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। অনেক লোন আছে সেগুলো কিভাবে পরিশোধ করব। পরিবার নিয়ে খাব কি?
জেলেরা বলেন, আকমল আলী ঘাটে অন্তত আড়াইশো বোট আছে। এই বোটগুলোতে প্রতিটিতে ৮ জন করে কাজ করতো। ৫ জন বোটের সাথে থাকত। বাকি ৩ জন জাল মেরামত করত। সেই হিসেবে ২ হাজারের বেশি পরিবারের রুটি-রুজির কেন্দ্র এটি।
প্রেম লাল দাশ বলেন, সবকিছু পুড়ে গেছে। একটি পোড়া মেশিন পড়ে আছে সেটি সরিয়ে নিচ্ছি। স্ক্রাপ হিসেবে বিক্রি করব। যা পাই সেটিই লাভ। সরকার আমাদের সহযোগিতায় এগিয়ে না আসলে আমরা আরও ভাতে মরব। আমার পরিবারের ৭ জন সদস্য। আমার ৮ জন শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়েছেন।
নৌকার কারিগর মোহাম্মদ আলী বলেন, আমরা ৫ জন এখানে নৌকা মেরামত করতাম। এখান থেকেই আমাদের আয় রোজগার। আমাদের পরিবার চলে এখানের আয়ে। আজ সকালে এসে দেখি আমাদের যন্ত্রপাতিসহ সব পুড়ে গেছে। তবে জেলেদের তুলনায় আমাদের কিছুই হয়নি। তারাতো সব হারিয়েছে। একই কথা বলেন, নৌকার কারিগর আব্দুল মালেক ও আবু তাহেরও।
মো. জুয়েল বলেন, আমার একটি চা দোকান আছে। আমার দোকানে আগুন লাগেনি। কিন্তু আমি সবাইকে মালামাল নিয়ে রাখার জন্য আমার দোকান উন্মুক্ত করে দিই। পরে দেখি আমার দোকান লুট হয়েছে। আগুনের মধ্যে আমার দোকান থেকে সব মালামাল অন্যরা নিয়ে গেছে।
সরেজিমনে গিয়ে দেখা গেছে, এখনও থেমে আগুন জ্বলছে আকমল আলী ঘাটে। বিশাল অংশ জুড়ে ধোঁয়া উড়ছে। ছড়াচ্ছে পোড়া গন্ধ। কেউ পোড়া ঢেউটিন, কেউ লোহার টুকরো কুড়িয়ে নিচ্ছেন। কেউবা পোড়া মেশিন সরাচ্ছেন, কেউ কুড়িয়ে নিচ্ছেন কালো কয়েন। কেউবা খুঁজছেন টাকা। পোড়া টাকা দেখে আপসোসও করছেন কেউ কেউ। এ যেন এক ধ্বংসস্তূপ।
প্রত্যক্ষদর্শী মো. সাগর বলেন, শনিবার সন্ধ্যায়ও আকমল আলী ঘাটে ছিল পুরোনো কর্মব্যস্ত পরিবেশ। অথচ রাত পেরিয়ে সকাল হলো। এখন শুধুই আগুনের ধ্বংস লীলা। মানুষের নিন্মবিত্ত মানুষগুলোর রুটি-রুজির জায়গাটি পুড়ে কালছে রূপ ধারণ করেছে, পুড়ে গেছে তাদের স্বপ্নও।
প্রসঙ্গত, শনিবার রাতে পৌনে বারোটায় আকলম আলী ঘাটে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। প্রায় ৪ ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এই ঘাটে জেলে ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কয়েক শ্রেণির মানুষের যাতায়াত ছিল। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অন্তত ২ হাজার মানুষ হঠাৎ বেকার হয়ে পড়েছেন ওই এলাকায়।