মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রড অয়েল না আসায় কাঁচামাল সংকটে রাষ্ট্রিয় একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রধান দুটি ইউনিট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি তিনটি ইউনিটে জ্বালানী উৎপাদন এখনও চলমান রয়েছে। তবে ইআরএল’র ডেড স্টক খালি করেই সেই তিনটি ইউনিট চালানো হচ্ছে। এই ডেডস্টক দিয়ে তিনটি ইউনিট চলবে বড়জোর ১০-১২ দিন। এরপর নতুন করে ক্রুড অয়েল না আসলে পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করতে হবে ইস্টার্ণ রিফাইনারী। যদিও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চালু থাকা ইউনিট থেকে এখনও দৈনিক মাত্র ১২০-১৫০ টন ডিজেল ও ১’শো টন পেট্রোল ও ২০০ টন বিটুমিন উৎপাদন হচ্ছে।
বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অপারেশন বিভাগের জিএম মোরশেদ আজাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ইস্টার্ন রিফাইনারি জানায়, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঁচটি ইউনিট রয়েছে। এগুলো হলো, এসফল্টিক বিটুমিন প্লান্ট, ভিসব্রেকার ইউনিট, ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট, কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট ইউনিট ও ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট। এর মধ্যে প্রধান দুটি ইউনিট বন্ধ করা হয়েছে কাঁচামালের সংকটের কারণে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারনে গত ১৮ ফেব্রুয়ারীর ১৮ পর আর কোন ক্রড অয়েল আসেনি চট্টগ্রামে। কাঁচামাল সংকটে মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে সবকটি প্লান্ট লো ক্যাপাসিটিতে চালানো হচ্ছিল। মঙ্গলবার সকালে ক্রডের মজুদ ফুরিয়ে আসে। কাঁচামালের স্টক ডেড স্টকে পৌঁছে যাওয়ায় ইআরএলের বড় ও প্রধান প্লান্টদুটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত ট্যাংকের তলানির ১.৫ মিটারের মতো ডেডস্টক ধরা হয়। গত রোববার বিকালে মজুদ ডেড স্টক স্পর্শ করে। এরপরও এক দিন প্লান্ট চালু রাখা হয়। সবশেষ মঙ্গলবার দুপুর থেকে বড় ও প্রধান দুটি প্লান্ট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ইআরএলের ক্রডের মজুদ এক মিটারের কাছাকাছি।
ইআরএল সূত্র জানায়, ইআরএলের মজুদ পাঁচটি ট্যাংকের তলানিতে প্রায় ৩৩ হাজার টন ক্রুড অয়েল ডেড স্টক ছিল। আর এসপিএম (মহেশখালী দ্বীপে অবস্থিত) থেকে পাঁচ হাজার টন তেল আনা হয়েছিল রিফাইনারিতে। তাই এখনো রিফাইনারির পুরো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়নি। সেই ডেড স্টক দিয়ে তিনটি ইউনিট চালানো হচ্ছে।
বুধবার বিপিসি’র অপারেশন বিভাগের জিএম মোরশেদ আজাদ জানান, পাঁচটি প্লাটের মধ্যে বর্তমানে তিনটি প্লান্ট চালু আছে। বাকি দুটি বন্ধ করা হয়েছে। চালু থাকা প্লাটগুলো থেকে বিপনন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দৈনিক ১০০ টন পেট্রোল ও ১২০-১৫০ টন ডিজেল সরবরাহ করছে ইআরএল। এছাড়াও ভালো পরিমাণে বিটুমিনও আসছে প্লান্ট থেকে। যতক্ষণ তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে ততক্ষণ পুরোপুরি বন্ধ বলা যাবে না। যে মজুদ আছে তা দিয়ে আরো ১০-১২ দিন এই তিনটি প্লান্ট চালু রাখা যাবে। আগামী ৫ মে ক্রড অয়েলের একটি চালান আসার কথা রয়েছে। চালানটি এলে পুরোদমে সবগুলো প্লান্ট চালু করা হবে।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে ৬৫-৬৮ লাখ টন বিভিন্ন ধরণের জ্বালানী তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। মূলত অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান ক্রুড’ আমদানি করা হয়। দেশে আনার পর অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলকে শোধন করে ইআরএল ডিজেল, পেট্রল, অকটেনসহ ১৬ ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করে। ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেল পাওয়া যায়। যা দেশের চাহিদার মাত্র ২৪ শতাংশ। বাকি ৭৬ শতাংশ তেল পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়।
বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, ইস্টার্ণ রিফাইনারী শোধনাগারটিতে ডিজেল পরিশোধন সীমিত হয়ে পড়লেও তাতে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়বে না। তারা বলছেন, শোধনাগারের জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি বন্ধ হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করছে সরকার। যে কারণে রিফাইনারি বন্ধের সাময়িক কোনো প্রভাব দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে পড়বে না।
ইআরএল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শোধনাগারটি দৈনিক গড়ে সাড়ে চার হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গত মাস থেকেই পরিশোধন কমিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টনে নামিয়ে আনে ইআরএল। গত ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ছিল দুই হাজার টন।