বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি। আর পহেলা জানুয়ারি মানেই স্কুলে স্কুলে বই উৎসব, শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে নতুন বই, কিছুক্ষণ পরপর বাড়ির সবার আড়ালে নতুন বইগুলোকে ছোট্ট মেহেরিমার দেখে নেওয়া। আর নাকের কাছে নিয়ে বইয়ের ঘ্রাণ শুকা। সেই বইয়ে মোড়ক লাগানো, সেলাই করা। আরও কতো কী? নতুন বইয়ের প্রতি সব শিক্ষার্থীরই থাকে এক অজানা ভালোবাসা। কিন্তু গতবারের মতো এবারও নতুন বই পাওয়া হয়নি মেহেরিমাসহ তার বান্ধবীদের। তাইতো বই নিয়ে কোন আলাপও জুটতে পারছে না তারা। মনে অজানা ভয়। কবে নাগাদ বই হাতে আসবে? কবেইবা ভালো মতন বই ওল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে নেবে। কবে শেষ করবে পরীক্ষার সিলেবাস। খানিক বাদে বাদে এসব উঁকি দিচ্ছে তার মনে। আর দৌঁড়ে গিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করছেন বাবা কবে পাব বই?
বুধবার (১ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের মাঝে কোন উচ্ছাস, আনন্দ লক্ষ করা যায়নি। নতুন বইয়ের ঘ্রাণও নিতে পারেনি তারা। তবে বই না পেলেও ক্লাসে যেতে হয়েছে তাদেরকে।
নগরের জামালাখানস্থ ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সকাল নয়টায় বালিকাদের এসেম্বেলী শুরু হয়েছে। এরপর তাদেরকে ক্লাসে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন প্রধান শিক্ষক। তবে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম শ্রেণির গুটিকয়েক শিক্ষার্থী একটি করে বই পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির দুই হাজারের অধিক শিক্ষার্থী থাকলেও কেউ সবকটি বই পাননি। অনেকে পাননি একটিও। একই চিত্র দেখা গেছে নগরের নাসিরবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়েও। সেখানে কোন কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একটি দুটি বই হাতে পেয়েছেন। এসব কারণে বছরের প্রথম দিনেও শিক্ষার্থী উপস্থিতি ছিল নগন্য।
একই চিত্র গ্রামের মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও। ফটিকছড়ির হাসনাবাদ এম এ হাইস্কুলের শিক্ষক কাজী মো. মহিউদ্দিন বলেন আমরা বই পাইনি। বই আসেনি। মুখে মুখেই পাঠদান শুরু করেছি। শিক্ষকদের যে অভিজ্ঞতা আছে তা দিয়ে ক্লাস চলবে।
সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. দিদারুল আলম বলেন, আমাদের কিছু কিছু বই এসেছে। তবে নবম ও দশম শ্রেণির বেশিরভাগ বই আসেনি। বাকি বইগুলো ১০ জানয়ারির মধ্য পাব বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও আমরা ক্লাস শুরু করেছি।
সকাল দশটায় নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন সবুর শুভ। তিনি জানান, আজ বছরের প্রথম দিন। ছেলে-মেয়েরা বই পাওয়ার আশা করে। কিন্তু কোন বই তারা পাইনি। যখন শুনেছে বই দেবে না তখন থেকে বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছিল না। এরপর নিয়ে আসলাম। তিনি আরও বলেন, কবে বই আসবে তাও শিক্ষকরা ঠিকমতো বলতে পারছেন না।
নগরের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফাতেমা নার্গিস বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কিছু বই এসেছে। নবম-দশম শ্রেণির বই খুব কম এসেছে। ১০ জানুয়ারির মধ্যে পাব বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বই না পেলেও তেমন কোন সমস্যা হবে না। এই মাস আমাদের অনেকগুলো ইভেন্ট আছে। পাশাপাশি সিটের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হবে। আর শিক্ষকরা আগের সিলেবাসে পড়াতে অভ্যস্ত। পড়োশোনায় তেমন প্রভাব পড়বে না বলে জানান তিনি।
নগরের মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফ হাসান চৌধুরী বলেন, আমরা প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ১টি এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৭টি করে বই দিতে পেরেছি। আমাদের ৬ হাজার শিক্ষার্থী আছে। আমরা ক্লাস শুরু করেছি এবং ক্লাস চলবে।
চট্টগ্রাম জেলা অফিসার উত্তম খীসা বলেন, আমাদের জেলায় এসএসসি, সমমান, ভোকেশনাল, কারিগরিসহ মোট চাহিদা ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৪ হাজার। এর মধ্যে বই এসেছে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ২৫০টি। অর্থাৎ আমরা ৩ শতাংশ বই পেয়েছি। এতে আমরা সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি ৩টি করে বই দিতে পেরেছি। তবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৬ টি বা ৭টি করে বই দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি চট্টগ্রামে যেখানে বই ছাপা হচ্ছে সাগরিকা ও আল মক্কা প্রেসে গিয়েছি। সেখোনে দেখতে পেলাম ওনারা বেশ জোরেশোরে ছাপার কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। সেই অনুসারে বলতে পারি আগামী ১০ জানুয়ারির মধ্যে সবকটি বই আমরা পেয়ে যাব।
জানা গেছে, জেলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এবং অন্যান্য মিলে মিলিয়ে বইয়ের মোট চাহিদা ২ কোটি ৪৮ লাখ। তবে এসেছে মাত্র আড়াই লাখ। অর্থাৎ ১ শতাংশ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, শিক্ষাক্রম পরিবর্তন,পাঠ্যবই পরিমার্জন, আগের দরপত্র বাতিল ও ছাপা সংক্রান্ত কাজ বিলম্ব হওয়াতে এবার সঠিক সময়ে বই দেওয়া যায়নি।
যেখানে প্রতিবার ডিসেম্বরের মধ্যে বই চলে আসতো সেখানে এবার জানুয়ারি ১ তারিখে বই এসেছে মাত্র ১ শতাংশ।
শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ২৮টি, মাধ্যমিক আছে ৫৬৬টি, স্কুল এণ্ড কলেজ আছে ৬৩টি। এছাড়াও জেলায় দাখিল মাদ্রাসা আছে ১২৭টি, আলিম আছে ৩৬টি, ফাজিল আচে ৬৪টি এবং কামিল আছে ১৯টি। সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৪ জন। তথ্য থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরে ৬টি শিক্ষা থানা আছে। এগুলোর বইয়ের চাহিদা ৬৮ লাখ ৭ হাজার ২৩৫। চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপ, বোয়ালখালীসহ কয়েকটি উপজেলায় প্রাথমিকের কোন বই পৌঁছায়নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এস এম আবদুর রহমান বলেছেন এখনো সব বই আসেনি। চাহিদার মাত্র ২৮ শতাংশ বই এসেছে। আশা করছি এই মাসের মধ্যে সব বই আসবে।