চট্টগ্রাম বুলেটিন

শিল্পায়নের আড়ালে কৃষিজমি ধ্বংসে মেতেছে প্যাসিফিক জিন্স

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নামে কৃষিজমি ভরাট, ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি এবং সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ব্যস্ত থাকাকালে একটি প্রভাবশালী চক্র শত শত একর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

পশ্চিম সৈয়দপুরে চলছে ভরাট কার্যক্রম
উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজায় দুইটি স্কেভেটর দিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে চারপাশ ৪০–৫০ ফুট উঁচু করে ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, সমুদ্র থেকে বালু তুলে কৃষিজমি ভরাটের মাধ্যমে শিল্পকারখানা নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এর আগেও একই এলাকায় বালু উত্তোলন করে জমি ভরাটের চেষ্টা হলে কৃষকরা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তা প্রতিহত করেন এবং পরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ:
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের ভাড়াটিয়া লোকজন এ কাজে জড়িত। যদিও অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কিছু কৃষক আর্থিক চাপে বা লোভে জমির মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও দাবি করেন এলাকাবাসী।

বাঁশবাড়িয়ায় নতুন করে শঙ্কা:
একইভাবে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের মগপুকুর এলাকায় ‘অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় একশ একর জমি ভরাট শুরু করেছে বলে জানা গেছে। এতে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, একটি জামে মসজিদ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যা পরিবেশ ও কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষিজমি ভরাট ও বালু উত্তোলন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এতে—
কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরিবর্তন
জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি
জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
উপকূলীয় ক্ষয় ত্বরান্বিত হওয়া
—এর মতো ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রশাসনের অবস্থান

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনী ব্যস্ততার ফাঁকে অনেকেই পরিবেশ ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠতে পারে।

পরিবেশ আইনে সম্ভাব্য শাস্তি:
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এ ধরনের কর্মকাণ্ড গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে:
🔹 বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫
পরিবেশ দূষণ, অবৈধ ভরাট বা প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড অর্থদণ্ড (লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী) উভয় দণ্ড প্রযোজ্য হতে পারে৷
পুনরাবৃত্তি ঘটলে শাস্তি আরও বাড়তে পারে।
🔹 বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০
অনুমতি ছাড়া বালু উত্তোলন বা কৃষিজমির মাটি কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ কারাদণ্ড (সাধারণত ২ বছর বা তার বেশি) অর্থদণ্ড ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জব্দের বিধান রয়েছে
🔹 কৃষিজমি সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান
কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন ও ভরাটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া জমির ব্যবহার পরিবর্তন প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা ডেকে আনতে পারে।

এলাকাবাসীর দাবি
স্থানীয়দের দাবি—
অবিলম্বে অবৈধ ভরাট বন্ধ
জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ
উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

 

Tags :

সর্বশেষ