চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে থানায় চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে থানায় ডেকে এনে স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩ নেতা ও যুবদলের এক নেতাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার করেছে স্বয়ং ওসি মো. মজিবুর রহমান। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ডে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই বলছেন, মূল আসামিকে আড়াল করতেই পরিকল্পিতভাবে এ নকশা এঁকেছেন ওসি। তার সাথে আওয়ামী লীগের আমি-ডামির এমপি এস এম আল মামুনের সাথে যোগসাজশ রয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে। রাজনৈতিক সচেতন মহল বলছে, বিএনপির বিরুদ্ধে মিডিয়া ক্যু করতেই এসব করছে একটি গোষ্ঠী। আর সেই চক্রের সদস্য সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মজিবুর রহমান।
এর আগে গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) সন্ধ্যার পর চা খাওয়ার কথা বলে একে একে ৪ জনকে ডেকে নেয় তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড থানার এসআই মো. রাসেল। পরে ওসি মজিবুর রহমান তাদেরকে হাজতে ঢুকানোর নির্দেশ দেন। এরা হলেন, মো. বশির (৩৫), মো. আনোয়ার হোসেন (৩৩), আরমান শাকিল (৩০), রাসেল (৩৮)। এদের মধ্যে বশির বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সেক্রেটারি, আনোয়ার হোসেন উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য, আরমান শাকিল মুরাদপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকদলের সদস্য সচিব, রাসেল মুরাদপুর ইউনিয়ন যুবদলের সেক্রেটারি।
এদিকে এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরীও। গত ৩১ মার্চ সোমবার ঈদের দিন সীতাকুণ্ড কেন্দ্রীয় ঈদ জামাতে বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সীতাকুণ্ড থানার ওসি মজিবুর রহমানের কক্ষে পরিকল্পিতভাবে বিএনপির কিছু নেতাকে ইচ্ছেকৃতভাবে কৃষকদল নেতা নাছির উদ্দীন হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। তারা আমার সাথে বিগত দিনে দীর্ঘ দিন জেলে ছিল। তারা অনেক নির্যাতিত। এসময় তিনি প্রশাসনকে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত আসামিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী বলেন, প্রশাসনকে বলবো প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনারা আমাদের সহযোগিতা পাবেন। এসময় তিনি ওসির উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি যদি ভায়াস্ট (প্ররোচিত) হয়ে এই মামলা করে থাকেন তাহলে আপনি যেখানে থাকেন না কেন আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে সামনের দিনগুলোতে।
অপরদিকে বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের ৪ নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা টক অব দ্য সীতাকুণ্ডে রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে হাটবাজার সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। গ্রেপ্তারদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদেরকে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারদের কয়েকজন হত্যার ঘটনার সময় বিভিন্ন এলাকায় ইফতার মাহফিলে ছিল। কোন ধরণের যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আনোয়ার হোসেনের ভাই জামশেদ উদ্দিন বলেন, আমার ভাই ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে হযরত ইয়াছিন শাহ মাজারে একটি ইফতার মাহফিলে ছিল। সেখানের ভিডিও ফুটেজ আছে। কোন ধরণের যাচাই-বাছাই ছাড়াই পুলিশ আমার ভাইকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দেয়। তাকে চা খাওয়ার কথা বলে ডেকে আনা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া যুবদল নেতা মো. রাসলের ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার ভাইয়ের সাথে বিএনপির কিছু নেতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেগুলো কোন ব্যবসা-বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব নয়। শুধু সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব কিংবা ভুল বুঝাবুঝি। আর নাছির আমার ভাইয়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। অথচ তাকে হত্যার মামলায় আমার ভাইকে গ্রেপ্তার দেখানো হলো।
অভিযোগ আছে, ওসি মজিবুর রহমান ৫ আগস্টের পর থেকে পতিত স্বৈরাচারের পক্ষ নিয়ে কাজ করছে। ডেভিল হান্টে কোন আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার দূরের কথা উল্টো ১৭ বছর ধরে নির্যাতিত বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ধরে ধরে জেলে দিচ্ছেন তিনি। এর আগে আওয়ামী লীগের এক ডাকাত গণপিটুনিতে নিহত হলে ওসি মজিবুর জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মামলা করে। এবার কৃষকদল নেতা নাছির উদ্দীন হত্যা মামলায় তিনি মূল আসামিকে বাঁচাতে কূটকৌশলের আশ্রয়ের নিয়েছেন।
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমে বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি গোষ্ঠী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সীতাকুণ্ডে কৃষকদল নেতা নাসিরুদ্দিন হত্যাও তারই অংশ। চারিদিকে ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার (২৬ মার্চ) সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিনকে সীতাকুণ্ডের হাতিলোটা এলাকায় নিজ বাড়ির ৩’শ গজ দূরে গলা কেটে জবাই করে হত্যা করেছে। পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্ত্রী বাদি হয়ে ৮ জনের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করেছে।
তবে নাসিরের নামাজে জানাজার দিন তার স্ত্রী মোমেনা আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে কাউকে চিনি না। তিনি শুধু জানান মাটি কাটার দ্বন্দ্বেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত করে কর্মকর্তা এসআই মোঃ রাসেল বলেন, তাদেরকে গ্রেপ্তার করার জন্য আমরা চা খেতে ডেকে আনার কৌশল অবলম্বন করেছি। আমরা যে কোন কৌশল অবলম্বন করতেই পারি। খুনিরা উন্মুক্তভাবে চলাফেরা করে কিনা, কিংবা আপনাদের দৃষ্টিতে সব খুনিই কেন উন্মুক্ত চলাফেরা করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হয়তো তারা ভেবেছে তারা আইনের আওতায় আসবেনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মজিবুর রহমান বলেন, হত্যাকারীরাতো হত্যার পর লাশ ধরে কাঁদেও। যুবদল স্বেচ্ছাসেবক দল নেতারাতো আমাকে কয়েকদিন আগে মিষ্টি খাইয়ে ফটোসেশনও করেছেন। তারা কিভাবে মামলার আসামি হলেন আমার জানা নেই। যারা আপনাকে মিষ্টি খাইয়ে ফটো সেশন করল তারাই হত্যা করল, আসামিরা যদি হত্যাকারী হয় তারা উন্মুক্তভাবে বাজারে চলাফেরা করছে কেন, কোন ক্লুতে আপনি বিষয়টি আমলে নিলেন জানতে চাইলে ওসি মজিবুর চুপসে যান।