চট্টগ্রাম বুলেটিন

হাতিয়া নয় ভাসানচরের আসল মালিক সন্দ্বীপ

নোয়াখালীর হাতিয়া নয় বরং সন্দ্বীপই ভাসানচর দ্বীপের মালিক। অথচ এটিকে আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং বহুল আলোচিত-সমালোচিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জোরপূর্বক হাতিয়া উপজেলার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। এবার অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের নির্দেশে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারের কার্যালয়ের সমন্বয়ে গঠিত সীমানা বিরোধ নিস্পত্তির নিমিত্তে করা কমিটিই জানিয়েছে দ্বীপটি সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। আর কমিটি থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ২ কর্মকর্তা লিখিত প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, কয়েকটি কারণে ভাসানচর সন্দ্বীপের অংশ। আজকের প্রতিবেদনে সেই কারণগুলোই তুলে ধরব আমরা।

গত ১২ মার্চ চট্টগ্রাম জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তা জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার বরাবরে সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টরের পৃথক তিনটি স্মারকের সূত্র মতে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম (সন্দ্বীপ), নোয়াখালী (হাতিয়া) অংশে আন্ত:জেলা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির নিমিত্তে গঠিত কমিটির গত ৬ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার কার্যবিবরণীতে জেলা সেটেলমেন্ট অফিসারের কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তাকে সীমানা চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই দুইজন কর্মকর্তাকে সন্দ্বীপ উপজেলার সি.এস ও আর.এস তুলনামূলক নকশার প্রেন্টাগ্রাফ করে স্ব স্ব সীমানা চিহ্নিতপূর্বক চাহিত তথ্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষান্তে সুষ্পষ্ট মতামতসহকারে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা।হয়।

তাদের দাখিল করা প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিরোধপূর্ণ ভাসানচর (স্থানীয় ভাষায় ঠেঙ্গার চর) নতুন জাগ্রত চরের অংশ। যা ২০১৬-১৭ জরিপ মৌসুমে দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে ৬ টি মৌজায় সৃজন করা হয়। মৌজাগুলো হলো ভাসানচর, শালিকচর, চর বাতায়ন, চর মোহনা, চর কাজলা ও কাউয়াচর। এতে আরও বলা হয়েছে, সি.এস. আর. এস এর প্রেন্টাগ্রাফ এবং Arch GIS পদ্ধতি পর্যালোচনা করে ভাসানচরের অংশটি (দিয়ারা জরিপে ৬ টি মৌজা) চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সীমানায় অর্ন্তভুক্ত বলে দৃশ্যমান হয়। অথচ দিয়ারা জরিপে এ ৬ টি মৌজা নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সকল বিষয় পর্যালোচনায় প্রকৃতপক্ষে বিরোধপূর্ণ এ চরটি (ভাসানচর) সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়।

কেন ভাসানচর সন্দ্বীপের?
দুই কর্মকর্তার সরেজমিনে ও তথ্য অনুসন্ধান করে তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষান্তে সি.এস ও আর.এস তুলনামূলক নকশার মিল পাওয়া গেছে। এতে কোন গড়মিল পরিলক্ষিত হয়নি। প্রকৃত বিরোধ পূর্ণ অংশ হলো ভাসানচর (স্থানীয় ভাষায় ঠেঙ্গার চর) এর অংশ। সি এস ও আর এস তুলনামূলক মৌজমিলি নকশায় ভাসানচর (ঠেঙ্গারচর) অংশে সি.এস ও আর.এস জরিপের কোন মৌজার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি পয়স্তি হওয়া অর্থাৎ নবজাগ্রত একটি চর।

আরো পড়ুনঃ ঈদের ছুটিতে সরকারি কর্মকর্তারা, পাহাড় কাটছেন মা ও শিশুর মোরশেদ হোসেন

গুগল ম্যাপের তথ্যানুসারে ১৯৯৬-৯৭ সনে প্রথম চরটি আংশিক দৃশ্যমান হয়। ১৯৯৮ সালে চরটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। অতঃপর ২০০৩ সালে পুনরায় স্বল্প পরিসরে একটি চর দৃশ্যমান হতে থাকে এবং পর্যায়ক্রমে ২০১৬-২০১৭ সালে এটি বর্তমান অবস্থানে রূপ নেয় তথা পয়স্তি হয়। অতঃপর এই চরটিতে ২০১৬-২০১৭ জরিপ মৌসুমে দিয়ারা জরিপ হয় এবং পুরো চরটি ৬টি মৌজায় বিভক্ত করা হয়। যা ভাসানচর, শালিকচর, চরবাতায়ন, চরমোহনা, চরকাজলা ও কাউয়ারচর নামে অভিহিত।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দিয়ারা জরিপের ৬টি মৌজার ডিজিটাইজ ম্যাপের সফট কপি Are GIS ম্যাপের মাধ্যমে গুগল ইম্পোর্ট দিলে ভাসানচরে দৃশ্যমান হয়। এই ৬টি মৌজাকে গুগল ম্যাপের কো-অর্ডিনেট অনুসারে বিশ্লেষণ করলেও সন্দ্বীপ উপজেলার মৌজমিলি ম্যাপের সীমানা অনুযায়ী এ উপজেলার অন্তভুক্তি প্রতীয়মান হয়। গুগল ম্যাপে দূরত্ব পরিমাপে ভাসানচর সন্দ্বীপের ন্যামস্তী মৌজা ম্যাপ থেকে ১ কি. মি. দক্ষিণ পশ্চিমাংশে অবস্থিত। যা স্থলভাগ থেকে প্রায় ৬.৫ কি. মি. এবং হাতিয়া উপজেলার স্থলভাগ হতে প্রায় ২১ কি.মি পূর্বাংশে অবস্থিত।

সন্দ্বীপ উপজেলার সি.এস ও আর.এস তুলনামূলক নকশার প্রেন্টাগ্রাফ Are GIS পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করে ভাসানচরের অংশটি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সীমানায় অর্ন্তভুক্ত মর্মে দৃশ্যমান হয়। সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার Demarcation ম্যাপ সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ জরিপ বর্ষে দিয়ারা জরিপের ৬ টি মৌজার ডিজিটাইজ ম্যাপের সফট কপি গুগল ম্যাপে ফেললে সন্দ্বীপ উপজেলার সীমানায় ভাসান চরের অংশে প্রতিস্থাপিত হয়।

জানা যায়, গত ২৩ মার্চ প্রতিবেদনটি চট্টগ্রাম জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার নিবেদিতা চাকমা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর বরাবরে পাঠিয়েছেন।

অপরদিকে একই দিনে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ সাদি উর রহিম জাদিদ অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) এর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। নোয়াখালীর (হাতিয়া) ও চট্টগ্রাম (সন্দ্বীপ) অংশে আন্তজেলা সীমানা বিরোধী নিষ্পত্তির নিমিত্তে গঠিত কমিটির প্রথম কার্যবিবরণী সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শিরোনামে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের চাহিদা অনুসারে চট্টগ্রাম জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার কার্যালয়ের পাঠানো প্রতিবেদম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভাসানচর (স্থানীয় ভাষায় ঠেঙ্গারচর) নতুনভাবে জেগে ওঠা একটি চর। ২০১৬-১৭ জরিপ মৌসুমে এখানে দিয়ারা জরিপ পরিচালনা করা হয়। ওইসময় পরিচালিত দিয়ারা জরিপে ভাসানচরকে ছয়টি মৌজায় বিভক্ত করা হয়। তবে দিয়ারা জরিপে ভাসানচরকে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়। কিন্তু সিএস ও আরএস এর মৌজা ম্যাপগুলো জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা যায় ভাসানচরটি চট্টগ্রাম জেলার একটি জেগে ওঠা চর। বিরোধপূর্ণ এ চরটি সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত।

Tags :

সর্বশেষ