নিজস্ব প্রতিবেদক:
আনু বেগম (৫০)। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বাসিন্দা। একমাত্র ছেলে সাজ্জাদ হোসেনকে অভাব-অনটনের কারণে খুব বেশি পড়াশোনা করাতে পারেননি। সংসারে নুন আনতে পানতা ফুরোয়। এসব দেখেই ২০ বছর বয়সী কিশোর সাজ্জাদ হোসেন বিদেশে পাড়ি জমানোর ইচ্ছে পোষণ করেন। ভাবেন মালেশিয়া গিয়ে চাকরী করে টাকা আয় করবেন, মাসে মাসে মা-বাবাকে টাকা পাঠিয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন রুপ পূরণ দূরে থাক। উল্টো সাজ্জাদ ও তার পরিবারে নেমে এলো এক দুর্বিষহ জীবন। গেল দুই বছর ধরে কান্না থামছে না তার মা-বাবার। সাজ্জাদও তাদের থেকে হাজার মাইল দূরে। মায়ানমারের কারাগারে বন্দি। মারধর, অতিরিক্ত কাজ, অনাহারসহ নানা শাস্তির সেই জীবনের ইতি টেনে অবশেষে মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) সাজ্জাদ ফিরেছেন তার মায়ের কোলে।
অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের উদ্যোগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মায়ানমার সরকারের কাছে আবেদন করা হয় ২১ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে। তারই ফলশ্রুতিতে সাজ্জাদসহ আরও ১৯ জন যুবক ফিরে আসে পরিবারের কাছে। তবে ফাইল না পৌঁছায় ফিরে আসেনি একজন যুবক।
মঙ্গলবার বিকাল পাঁচটায় নগরের কাজির দেউড়িস্থ সার্কিট হাউজে একটি বিজনেস ক্লাস বাস এসে ঢুকে। এসময় কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদেরকে একে একে বাস থেকে নামানো হয়। মুহুর্তেই কান্নায়ে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। এসময় সার্কিট হাউজে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
শুধু সাজ্জাদ নয় একই পরিণতি হয় ১৭ বছরের কিশোর ফয়সালেরও। ২০ বাংলাদেশিকে আনার আগে স্বজনরা অপেক্ষা করতে থাকেন সার্কিট হাউজে। এসময় নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা সাজ্জাদের মা আনু বেগম বলেন, আজ ২ বছর পর ছেলেকে ফিরে পাচ্ছি। কিন্তু মনে হচ্ছে অনেকগুলো বছর দেখিনা। আমার কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে। এখনও কেন আমার ছেলেকে আনছেনা তারা।
তিনি আরও বলেন, প্রতিমাসে ৩-৫ হাজার টাকা করে পাঠাতে হতো ছেলেকে। ছেলেকে কিভাবে কার চক্রে পড়ে মায়ানমারে গিয়ে আটকা পড়লেন তাও তিনি জানেন না। প্রায় সময় ছেলে কল করে বলতো মা আমাকে টাকা পাঠাও। আমরা খেতেই কষ্ট হতো সেখানে আবার তাকে টাকা দিতে হতো। যা ছিল মরার উপর খাঁড়ার ঘা। এরপর ছেলের দিকে তাকিয়ে টাকা ধার করে মানুষের হাতে পায়ে ধরে টাকা নিতাম। তার জন্য এখন আমার ২ বছরে ২ লাখ টাকা লোন হয়েছে। গেল ২ মাস ছেলের সাথে কথা হয়না। ঈদেও কথা হয়নি। এই দুই মাস ঘুম কি তা চোখে আসেনি। আমার জন্য ঘুমাতো না সাজ্জাদের বাবাও। মাঝরাতে আমার হৃদয় কেঁপে ওঠতো ছেলের জন্য। কালকে যখন শুনি ছেলে আসতেছে তখন তাড়াহুড়োয় ভুল করে কক্সবাজার করে চলে গেছি। পরে শুনি চট্টগ্রামে। আবার সেখান থেকে চট্টগ্রামে আসি।
একই কথা বলেন, টেকনাফের ফয়সালের মা রিজিয়া বেগম। তিনি বলেন, আমার ছেলে নাকি মায়ানমারের কারাগারে পাগল হয়ে গেছে। তাকে ভালো করতে অনেক টাকা লাগবে। কল করে এসব ভলা হতো। এরপর আমি মানসিকভাবে পাগল হয়ে যেতাম। এদিক-ওদিক করে ১০ হাজার, ১৫ হাজার করে টাকা দিতাম। ছেলের বাবা আয় করে সব তাকে পাঠাতো। এভাবে অনেক টাকা দিয়েছি শুধু ছেলে কষ্ট না করার জন্য। কাকে এসব টাকা দিতেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, টেকনাফের একজন লোক আছে তিনি মায়ানমারের জেলের পুলিশের সাথে যোগাযোগ আছে। তিনি টাকাগুলো পৌঁছে দিতেন।
তিনি বলেন, শেষ ২ মাস রোজা, ঈদেও আমাদের সাথে ছেলের কথা হয়নি। এই সময়গুলি ছিল খুব হৃদয়বিদারক। সারাক্ষণ নামাজ পড়ে ছেলের জন্য দোয়া করতাম।
এদিকে মহেশখালী সেতারা বানু বলেন, আমার স্বামী দেশে কাজ করে আয় করতো। কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য মালেশিয়া যেতে চেয়েছিল। আমাদেরকে কিছু বলেনি। কিন্তু উনি মায়ানমারে আটকা পড়ে। তিনি যাওয়ার পর আমাদের কষ্ট বেড়ে যায়। আমি নিজে সংসারের হাল ধরতে হয়। ওনাকেও টাকা পাঠাতে হতো। সেই সংগ্রাম, কষ্ট আর স্বামীকে ছাড়া থাকার দুঃখ কোনদিন ভুলতে পারব না। জীবনে কোনদিন ভাবিনি এমন হবে। তিনি আরও বলেন, আমার দুধের সন্তানকে রেখে তিনি বিদেশের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়েন। কিন্তু কয়েক মাস পর কন্যা সন্তানটি অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সে মারা যায়। অনেক দিন ওর বাবাকে খবরটা শুনায়নি। আমি কল কেটে কান্না করতাম। মেয়েকে হারালাম, স্বামীও নেই। এর চেয়ে দুঃখ আর আছে কিনা আমার জানা নেই। আজ স্বামী ফিরে আসল কিন্তু সন্তান নেই। আমার মেয়ে তার বাবাকে দেখে যেতে পারল না। বলেই সেতারা বানু কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অপরদিকে মরিয়ম আক্তার বলেন, তার স্বামীও রাবার বাগানে কাজ করতেন কক্সবাজারে। কিন্তু মালেশিয়া যাওয়ার পথে তিনি মায়ানমার পুলিশেল কাছে ধরা পড়েন। এরপর তার ঠাঁই হয় রেঙ্গুম কারাগারে। সেই থেকে স্বামীকে ছাড়া দুই বছর। কোনদিন স্বামী আসবে কিনা ভাবেননি। কারণ মায়ানমার যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ। সংসার আর দু্ই সন্তানের জীবন বাঁচাতে তাকে নিতে হয় পোশাক কারাখানার চাকরীও।
মায়ানমার থেকে ফিরে আসা ফয়সাল বলেন, কারাগারে কাজ কম করলে তাদের নানা শাস্তি দেওয়া হতো। মারধরসহ, অতিরিক্ত কাজ করানো হতো। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তারা জেলে যান। ২ বছর সাজা দেওয়া হলেও সশ্রম থেকে তারা এক বছর মাফ পান। কিন্তু নানা জটিলতায় তারা আসতে পারেননি। এবার আসতে পেরে তারা সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০ জনকে পরিবারের জিম্মায় দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২০ বাংলাদেশীর পরিচয় যাচাই-বাচাইয়ের পর মায়ানমার সরকারের কাছে আবেদন করে ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি বলেন, আমাদের দেশে একটি অবৈধ কিছু রিক্রুট এজেন্সিসহ দালাল চক্র যেমনি সক্রিয়। তেমনি আমাদের গ্রামাঞ্চলের পড়াশোনা না জানা, না বুঝা মানুষগুলোও এসব ফাঁদে পা দিচ্ছে। ফলে জীবনে নেমে আসছে দুর্বিষহ যন্ত্রণা। বিদেশে গমনে আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে, সচেতন হতে হবে। সাগর পথে বিদেশে যাওয়া পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করতে হবে।