নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। এবার মন্ত্রণালয়টির মুখপাত্র (গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুলিবর্ষণকারী আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের সহযোগী মোহাম্মদ আবু আবিদ। আওয়ামী লীগ নেতার মুখপাত্র থেকে রঙ বদলিয়ে রাতারাতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হয়ে যাওয়া নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। গত বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সাইফ উদ্দিন গিয়াস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া মুহাম্মদ আবু আবিদের পৈতৃক নিবাস পটুয়াখালীতে। পরিবারসহ থাকেন চট্টগ্রামের হালিশহরে। নিজেকে একসময় মেডিকেলের ছাত্র পরিচয় দিলেও কোন মেডিকেলে তা স্পষ্ট করতেন না। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র বলে দাবি করেন নিজেকে। যদিও তার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের প্রচারমুখী প্রায় সব কাজেই নিজেকে ব্যতিব্যস্ত রাখতেন তিনি। ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম ছেড়ে চুপিসারে চলে যান ঢাকায়। ফেসবুক প্রোফাইল ঘুরে দেখা গেছে, আবিদ ‘দূর্বার তারুণ্য ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন নিজেকে। তার পরিচয় হিসেবে লেখা আছে ঢাকা থেকে প্রকাশিত (ভুঁইফোড় পত্রিকা) আলোকিত প্রতিদিন-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও অনলাইন চিফ, টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ট্র্যাব)-এর মুখপাত্র ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন ক্রাইম রিপোর্টার্স সোসাইটির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তবে এসব সংগঠন বহুল পরিচিত কিংবা মূলধারায় নয়। ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচনে পর্যবেক্ষকও ছিলেন এই আবিদ।
আওয়ামী লীগ নেতা বাবরের মুখপাত্র: আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের মিডিয়া ম্যানেজার ছিলেন মোহাম্মদ আবু আবিদ। বাবরের হয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখা, ফেসবুক লাইভ প্রচার, প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন এমনকি ‘সামাজিক সংগঠন’ ব্যানারে প্রোপাগান্ডা-সবকিছুতেই ছিল তার সরব উপস্থিতি। বাবরের সঙ্গে টকশো, বৃক্ষরোপণ, শীতবস্ত্র বিতরণের ডজন ডজন ছবি আবিদের। এসব ছবি গতকাল থেকে নেটিজেনরা সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল করা শুরু করেছেন। ৫ আগস্টের আগে ফেসবুকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতা তার প্রশংসা করে পোস্টও করেছেন, যার স্ক্রিনশট নতুন করে আসছে ফেসবুকে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের সংগঠক রাসেল আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখনও ফ্যাসিস্টের দোসররা চালাচ্ছে। না হয় যুবলীগের সন্ত্রাসী বাবরের সহযোগী কীভাবে পদ পায়? দ্রুত তাকে সরাতে হবে। সঙ্গে তাকে যারা এই পদে বসিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
মনসুর নবী নামের শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন, আজ থেকে বিএনপি নির্বাচন চায় এমন কিছু ট্রল করব না, শপথ করলাম। বাবরের সহযোগী একজন ভুয়া সাংবাদিক যদি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হতে পারে, তাহলে এই ইন্টেরিম সরকারের উদ্দেশ্য ও বিধেয় নিয়ে বিএনপির সন্দেহ পুরোপুরি সঠিক। এরা কি সত্যিই কোনো সংস্কার করবে?
৫ আগস্টের পর ঢাকায় চলে যান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র আবু আবিদ। নিয়মানুযায়ী তিনি তৃতীয় বর্ষে থাকার কথা। কিন্তু দুই বছর স্টাডি গ্যাপের কারণে এখনও তিনি প্রথম বর্ষে। তার সহপাঠী ও শিক্ষকরাও তাকেম চেনেন না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাঝেমধ্যে আবিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন। প্রায় সময়ে প্রাইভেটকার ব্যবহার করতেন ক্যাম্পাসে। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তার কোনো ভূমিকা ছিল না। ৫ আগস্টের পর তিনি ঢাকায় চলে যান।
চবির সাবেক ছাত্র ও সংবাদকর্মী নুর নবী রবিন ফেসবুকে লিখেন, আবিদ ৫ আগস্টের পর এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে ঢাকা চলে গেল। সেখানে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পদে নিয়োগ পেল ইন্টার পাস যোগ্যতা দিয়ে। এটা কি নতুন বন্দোবস্ত?
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আবু আবিদ আমাদের সময়কে বলেন, বাবরের সঙ্গে আমার বৃক্ষরোপণের ছবি আছে। ‘দূর্বার তারুণ্য ফাউন্ডেশন’ থেকে আমরা চট্টগ্রামে গাছ লাগিয়েছিলাম। সেখানে বাবর অর্থায়ন করেছিলেন। মূলত সামাজিক কর্মকা-েই বাবরের সঙ্গে আমরা পরিচয় হয়। তার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সম্পর্ক আমার নেই। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বলে একজনকে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিন। ওই ব্যক্তি নিজেকে সাইফ খান পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, আদিব আমাদের সংগঠনের সদস্য। তার বিরুদ্ধে জামায়াত ষড়যন্ত্র করছে।
স্টাডি গ্যাপের বিষয়ে আবিদ জানান, সাংবাদিকতায় সময় দেওয়ার কারণে তিনি পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারেননি। তবে তিনি সাংবাদিকতা করার কথা দাবি করলেও চট্টগ্রামের কোনো সাংবাদিক তাকে চেনেন না। তিনি কোথাও কাজ করেছেন এমন তথ্যও মেলেনি।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের সংগঠক রাসেল আহমেদ বলেন, আবিদ চবির ছাত্র! এটা আপনার থেকে শুনলাম। ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আমরা চিনি। আর ইন্টার পাস একজন শিক্ষার্থী কীভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হয়, তা আমার বোধগম্য নয়। এমন বিতর্কিত নিয়োগ দিয়ে সরকার ছাত্র-জনতার রক্তের সঙ্গে বেইমানি করছে।
সূত্র: আমাদের সময়