প্রায় সাড়ে আট বছর জেলে থাকার পর স্বৈরাচারী হাসিনার পতনের ফলশ্রুতিতে যখন জেলমুক্ত হলাম তখন দেখলাম আমার আদরের সেই মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। বাবা হিসেবে চোখের সামনে তাকে আর বড় হতে দেখলাম না আমি। তাকে আমি সময় দিতে পারলাম না। তার গ্রোনআপটাই আমার দেখা হয়নি। আপনারা জানেন যে, ছেলেমেয়েরা যখন পরীক্ষার হলে যায়, তারা বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে এবং হল থেকে সন্তান বের হলে ছেলে মেয়েকে এটা-ওটা খেতে দেয়, স্নেহ করে হাত ধরে বাসায় ফেরে। আমিও নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম নই। অন্য দশজন মা-বাবার মতো আমারও এমনটা প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি আমার মেয়েকে নিয়ে হলে যেতে ও বাইরে অপেক্ষা করার সৌভাগ্য হয়নি। এমনকি আমি বাবা হয়ে তার বেড়ে ওঠাটাই দেখা থেকে বঞ্চিত হলাম।
বুকে কষ্টের পাথর নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন একজন বাবা। যিনি ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে জীবনের প্রায় ৯ বছর জেলে কাটিয়ে দেন। একমাত্র কন্যা সন্তানকে নিয়ে বাবা হিসেবে তার যেই স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্খা ছিল সেসব শেষ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। যা আর কখনও ফিরে আসবে না। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব লায়ন অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী, এফসিএ।
জেল ও রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিতে গিয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪ বছর আগে আমার জন্ম। স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক কিছুই আমি দেখেছি। আমরা অনেক পরিবার ছিলাম। সাত ভাই দুই বোন আমরা। যুদ্ধের সময় আমরা পালিয়ে পুকুরের ওপারে চলে যেতে হয়েছে। এরকম একটা পরিবেশে আমরা বেড়ে ওঠি। আমি ১৯৮১ সালে এসএসসি শেষ করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগে আমরা লেখাপড়া করি। পরবর্তীতে ট্র্যাক পরিবর্তন করে আমি একাউন্টিং বিভাগে চলে যায় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করি। পাশাপাশি অনার্স করার পর আমি চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টে ভর্তি হই। এক পর্যায়ে বিসিএসে অংশগ্রহণ করে এডুকেশন ক্যাডারে আমার চাকরি হয়। সব মিলিয়ে দুই বছর সাত মাস আমি চাকরি করি। ইতিমধ্যে আমি চার্টার্ট একাউন্ট্যান্ট হয়ে যাই। এরপর সাথে সাথে আমি চাকরীটা ছেড়ে দিই। অবশ্যই এটি আমার ক্যারিয়ারের পরিকল্পনার অংশ ছিল যে চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট হওয়ার পর আমি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে অধ্যাপনার চাকরিটা ছেড়ে দিব। ওইসময়ে চাটার্ড একাউন্ট্যান্টের বেশ ভালো ডিমান্ড ছিল বর্তমান সময়ের চেয়ে। এরপর আমি আমার এলাকার কনফিডেন্স সিমেন্টে সিইও হিসেবে জয়েন করি। প্রায় সাত বছর আমি সেই কোম্পানিতে ছিলাম। অনেক লোককে চাকরি দিতে পেরেছি, পাশাপাশি সামাজিক কাজ করেছি। আমি তখন লায়ন্স ক্লাবে যুক্ত ছিলাম।
তিনি বলেন, লায়ন্স ক্লাবের আওতায় আমরা বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প দিতাম। যেখানে অসংখ্য গরিব, অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষ বিনামূল্যে চোখের জটিল চিকিৎসা করাতে পারতো, ওষুধ, চশমা পেতো। এসব কাজ নিয়মিত করার ফলে আমার জনসাধারণের সাথে একটা সম্পৃক্ততা চলে আসে। এছাড়াও আমি মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিতাম। সমাজের উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ রক্ষা, খেলাধূলা, নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে শিক্ষামূলক কাজে ভূমিকা রাখতাম। একপর্যায়ে মানুষজন আমাকে উৎসাহিত করতে লাগল যে, আপনি রাজনীতিতে যুক্ত হলে আরো বড় পরিসরে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবেন।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, এরপর আমার মনেও উপলব্ধি হলো যে, আমি যদি একটি ব্রিজ করতে চাই, একটি রাস্তা করতে চাই, একটি স্কুল কিংবা কলেজ করতে চাই, অথবা একটি ইকোনমিক জোন করতে যায় মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তাহলে সেটি আমার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার সেই চিন্তা থেকে আমি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই এবং মনে সেই চিন্তাকে লালন করতে থাকি। তবে আমার খুব বেশি প্রত্যাশা ছিলোনা। এভাবে নানা সামাজিক কাজ করতে করতে যখন মানুষজন আমাকে অনেক বেশি এপ্রোচ করতে শুরু করলো তখন আমি চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিই রাজনীতিতে যোগ দেয়ার।
তিনি বলেন, খুব অল্প সময়ে আমি রাজনীতিতে যোগ দিই এবং মানুষের জন্য কাজ করি, মানুষের কাছাকাছি গিয়ে আমি দলের কর্মকাণ্ডগুলো তুলে ধরি। দলের চেয়ারপারসনের আস্থাভাজন হওয়ার মধ্য দিয়ে আমি অত্যন্ত সুচারুরূপে দলীয় কাজগুলো করতে পেরেছি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটা পরিবর্তনের সাথে মানুষকে খাপ খাইয়ে চলতে হয়। এবং সেভাবে চলতে পারলে দেশ ও জনগণের কল্যাণ হয়। এসব চিন্তা চেতনা মাথায় রেখে কাজ করতে থাকি এবং একটা সময় আমার খুব বেশি সামাজিক কর্মকাণ্ড ও জনসাধারণের সাথে সম্পৃক্ততা দেখে আওয়ামী লীগ সরকার আমাকে টার্গেট করে নেয়। এরপর ২০১৬ সালে বিনা দোষে, বিনা কারণে আওয়ামী লীগ সরকার আমাকে গ্রেফতার করে আট বছর তিন মাস জেল খাটায়।
আমি যেদিন গ্রেপ্তার হই তারপরের দিন আমার মেয়ের ও লেভেল পরীক্ষা। আমার একটিমাত্র সন্তান, তার নাম মেহেরীন আনহার উজমা। যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখলাম যে, সরকার আমাকে গ্রেফতার করবে তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি আমার মেয়ের পরীক্ষার পরদিন গ্রেফতার হব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাকে আমার মেয়ের পরীক্ষার আগের দিনই অর্থাৎ ১৫ ই মে ২০১৬ তারিখে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ১৬ই মে আমার মেয়ের পরীক্ষা ছিল।
এর আগে ২০২১ সালের ২৪ মার্চ কারাবন্দি বাবাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হৃদয়স্পর্শী এক পোস্ট দেন আসলাম চৌধুরীর মেয়ে মেহরীন আনহার উজমা। তার ওই স্ট্যাটাসটি ব্যাপক ভাইরাল হয়। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওঠ আসে। পাঠকের জন্য তার সেই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
আমার বাবা আসলাম চৌধুরী-‘
“আমি প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি দেখিনি, কখনো মাপতে যাইনি এর গভীরতাও
কিন্তু দেখেছি আমার বাবাকে, যার হৃদয় এতটাই গভীর যে, তার অবুঝ সন্তান এই গভীরতায় যেভাবে ইচ্ছে বিচরণ করতে পারি সামুদ্রিক প্রাণিকুলের মতো’।”
হ্যাঁ, আমি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতা ৫ বছর ধরে মিথ্যা অভিযোগে কারান্তরিত এবং নির্যাতিত মো. আসলাম চৌধুরীর একমাত্র সন্তান। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে তিনি আজ আমার ছোট তিনজনের পরিবার এবং বাবার বৃহৎ পরিবার বিএনপি থেকে ৫ বছর ধরেই বিচ্ছিন্ন। অথচ নিজের ক্যারিয়ারে সম্পূর্ণ সফল। আমার বাবা আর্থিক কারণে নয়; কেবলমাত্র নিজ এলাকা সীতাকুণ্ডের জনসাধারণের কল্যাণার্থে এবং বিএনপির প্রতি ভালোবাসার কারণেই রাজনীতিতে আসা তার। বাবা একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, চাকরি জীবনের শুরুতে বিসিএস কর্মকর্তাও ছিলেন। ব্যবসায়িক জীবনেও সফল ছিলেন আমার বাবা। পরবর্তীতে তিনি লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমার বাবার সমস্ত ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক অর্জন, সেই সঙ্গে আমার পরিবার ধ্বংসপ্রায়।
২০১২ সাল থেকে আমার বাবাকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হতে হয়। এরপর ২০১৬ সালে আমার দেশপ্রেমিক বাবাকে সম্পূর্ণ বানোয়াট মামলায় গ্রেফতার করা হয়, যার কোনো বিন্দু পরিমাণ সত্যতা নেই। বাবা নিজেও অনবরত কারাবন্দিত্বে শারীরিক এবং মানসিক নাজেহাল হয়ে অসুস্থ প্রায়। বাবার অনুপস্থিতিতে তার অর্জিত ব্যবসা বাণিজ্যও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এছাড়া আমার মাকেও হতে হচ্ছে বিভিন্নভাবে নাজেহাল। বাবার অবর্তমানে মা আর আমি শুধু অন্ধকারই দেখছি চারিদিকে। এতকিছুর পরেও আমার সাহসী বাবা পথভ্রষ্ট হননি, অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। যে রাজনীতি সারাজীবনের অর্জিত জীবনকে ধ্বংস করে, পরিবারের সদস্যদের শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতির কারণ হয়; কি দরকার সেই রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার? আপনারা যারা আজ মিথ্যা অভিযোগে, অযৌক্তিক কারণে বাবাকে গত ৫ বছর ধরে কারান্তরীণ রেখেছেন, যার ফলে প্রতিনিয়ত আমি হচ্ছি বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত, আপনাদেরও কি পরিবার নেই, সেই যন্ত্রণা কি আপনাদের অনুভবে আসে না? প্রসঙ্গত, আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
২০১৬ সালে বাবার গ্রেফতারের পরদিন আমার ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা ছিল। কী মানসিক কষ্ট নিয়ে আমি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলাম তা শুধু আমি উপলব্ধি করতে পারি। সেই ২০১২ সাল থেকে বাবা আমাদের কাছ থেকে দূরে। কেউ কি একবারের জন্যও ভেবে দেখেছেন পরিবারের এই ছোট্ট মেয়েটির কথা? আমার দিকে তাকিয়ে মা নীরবে কাঁদেন। আমাকে দেওয়ার মতো সান্ত্বনা হয়তো মায়ের ঝুলিতে ফুরিয়ে গেছে। আজ যারা নির্যাতনের ছড়ি ঘুরাচ্ছেন, মনে রাখবেন নিঃসন্দেহে সবার ওপরে একজন তো আছেনই- তিনি তো উত্তম বিচারকর্তা। ইনশাআল্লাহ, আমি তার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে আজ আমার বাবা এবং পরিবারের নির্যাতনের ভার সেই মহানের ওপরই অর্পণ করছি। তিনিই অবশ্যই এর বিচার করবেন। সব নির্যাতনের অবসান হোক। সহসা বাবা মুক্তি পাক। আর কোনো মিথ্যা মামলা নয়। আমি চাই আমাদের তিনজনের ছোট পরিবারটি আবার এক হোক।
বাবা তুমি ফিরে এসো, আমি আর মা প্রতি মুহূর্তেই তোমার অপেক্ষায়।-একমাত্র সন্তানের আকুতি
কে/এম