চট্টগ্রাম বুলেটিন

রাত পোহালেই ভোট, কে হচ্ছেন মিরসরাইয়ের সাংসদ?

আনোয়ারুল হক নিজামী, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) থেকে :

আ’লীগ ৬, বিএনপি ৫, জাপা ১

২৭৮ নং চট্টগ্রাম -১ মিরসরাই আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার জমজমাট নির্বাচনী লড়াইয়ে জমে উঠেছে ভোটের মাঠ ।
এই আসনে কে হচ্ছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাংসদ? এই প্রশ্নে উদ্বেগ উৎকন্ঠা ভোটারদের।
এর আগে এই আসন থেকে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ৫ বার বিএনপি’র ওবায়দুল হক খন্দকার ২ বার বিএনপির এম এ জিন্নাহ ২ বার এডভোকেট আবু সালেক ১ বার আ’লীগের মাহবুর রহমান রুহেল একবার।

১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন প্রথমবার স্বাধীন বাংলাদেশে ৪৮৮৫৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়। ন্যাপের মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমী পায় ৪৬৮৫ ভোট জাসদের হারুনুর রশিদ ২৮৪৬ ভোট পায়।

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ ১৯৭৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির ওবায়দুল হক খন্দকার ২০৭১৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগের ফজলুল হক বিএসসি (মালেক উকিল) ২০১৮২ ভোট ও এমএলএ মেজর আলী আকবর চৌধুরী ১০৮৬৪ ভোট পায়।

তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৮৬ সালের ৭ মে বিএনপি বিহীন নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ৩৫ ৯২৯ ভোটে বিজয়ীহোন। জামাত ইসলামের মাওলানা শামসুদ্দিন ১৯৬৩৭ ভোট ও জাতীয় পার্টি এডভোকেট আবু সালেক ২২ হাজার ৭১৩ ভোট পায়।

চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত ভোটে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে প্যাড সর্বস্ব ৭৩ দল নিয়ে নির্বাচন করে মিরসরাই থেকে এডভোকেট আবু ছালেক একতরফা ভোটে বিজয় হয় মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের বটগাছ প্রতীকের প্রার্থীকে পরাজিত করে।

১৯৯১ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চমক দেখিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এই অঞ্চলে বিএনপির নবাগত প্রার্থী সাবেক পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মাহফুজুলকের ছেলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ৬৬ ৯৬৯ ভোট অপরদিকে আওয়ামী লীগ হেভিওয়েট প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ ৪৮০৩০ ভোট ও জামাতের প্রার্থী মাওলানা শামসুদ্দিন ১০৬০৫ ভোট পায়।

৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিরোধীদল বিহীন এক তরফা নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী ওবায়দুল হক খন্দকার দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী মনজুরুল আলম, যুবদলেরে উত্তর জেলা নেতা এম এ কাশেম। ঐ সরকারের মেয়াদ ছিল মাক্র ৪৩ দিন।

৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপাকে পড়ে বিএনপির হাই কমান্ড। মিরসরাই বিএনপির চরম দলীয় কোন্দল ঠেকাতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজে প্রার্থী হলে তিনি ৬৬৩৩৬ ভোট আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ৬২০৪৩ ভোট, জামাতের বদি আলম ৬১০২ ভোট, জাপার আলী আশরাফ ২৩৮২, সাম্যবাদী দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব দিলীপ বড়ুয়া ৫২৭ ভোট পায়।

১৯৯৬ সালে মিরসরাই আসন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছেড়ে দিয়ে ফেনী-১ ছাগল নাইয়া, পরশুরাম, ফুলগাজি আসনটি থেকে সংসদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে এখানে উপ-নির্বাচনে এম এ জিন্নাহ আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনার মোশাররফ হোসেনের নিকট পরাজিত হয়।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী এম এ জিন্নাহ ৮৮৮৩৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হোন। আ’ লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ৮২৩৩৩ ভোটে দ্বিতীয় হোন, ইসলামিক ফ্রন্ট ৯২১ ভোট সাম্যবাদী দলের কেন্দ্রীয় নেতা দিলীপ বড়ুয়া ৩০৭ ভোট পায় পরবর্তীতে তিনি ২০০৯ সালে টেকনোক্রেট কোটায় শিল্প মন্ত্রী হোন।
২০০৮ সালে ২৯ শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮৪. ৪৩% ভোট কাস্টিং হয়। বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক কামাল উদ্দিন চৌধুরী ৯৪ ৬৬৫ ভোট, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোশাররফ হোসেন ১০৫ ৩৩৯ পেয়ে বিজয়ী হয়।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা ভোটে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন বিজয়ী হোন। স্বতন্ত্র বা বিদ্রােহী প্রার্থী হতে গিয়ে আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন নানামুখী ষড়যন্ত্রে ভোট থেকে দুরে থাকায় বিনা ভোটের ১ম বারের সাংসদ নির্বাচিত হোন।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮৭.৯৭ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়।
এতে আওয়ামী লীগের দাপটের সরকারের একক প্রার্থী মোশাররফ হোসেন ২৬৬৬৬৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হোন। একচেটিয়া মাঠ দখলের ভোটে বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যান মাঠে দাঁড়াতেই পারেননি। এজেন্ট বিহীন একতরফা ভোটে তিনি মাত্র ৩৯৯১ ভোট পান। ইসলামিক ফ্রন্ট আব্দুল মান্নান ২৫৮৩ ভোট।

২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি আমি তুমি ডামির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোশাররফ পুত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহাবুর রহমান রুবেল ৮৯০ ৬৪ ভোট ও স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী প্রার্থী) আ’লীগ নেতা গিয়াস উদ্দিন ঈগল প্রতিকের প্রার্থী ৫২৯৯৫ ভোট জাতীয় পার্টি লাঙ্গল ৪০৮ ভোট পায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
মিরসরাই আসনে বিএনপি মনোনীত নুরুল আমিন চেয়ারম্যান , জামায়াতে ইসলামী মনোনীত অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত অ্যাডভোকেট ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ মনোনীত রেজাউল করিম, জাতীয় পার্টি মনোনীত সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন, মুসলিম লীগ মনোনীত শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, জাসদ (আসম আঃ রব) মনোনীত একেএম আবু ইউসুফ প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তবে নির্বাচনী মাঠে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ— এ চার দলের মনোনীত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকেরা তুমুল প্রচারণা চালিয়েছেন।

স্থানীয় ভোটাররা জানান, ভোটের মাঠে অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে ধানের শীষের প্রার্থী নুরুল আমিন ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান এগিয়ে আছেন। তবে বেশিরভাগ ভোটার নীরব থাকায় এই দুজনের মধ্যে কার জেতার সম্ভাবনা বেশি, সে ব্যাপারে এখনই কিছু আন্দাজ করা যাচ্ছে না।

এছাড়া তরুণ ভোটার এবং ৭ বারের বিজয়ী আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে এবার।

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। প্রচারণার মাঠে দুই দলের প্রার্থী সমানভাবে এগিয়ে থাকলেও তরুণ ভোটাররা ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষ্য, এবারের নির্বাচনে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবে বিএনপি।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীও সুসংগঠিত হয়ে মাঠে নেমেছে। তাদের কর্মীবাহিনীর পাশাপাশি মহিলা কর্মীরাও প্রচারণা চালাচ্ছেন।

উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে বিস্তৃত মিরসরাই উপজেলার এ নির্বাচনী আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৭৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮৫৯ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮১১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছে ৪ জন। এ আসনে এবার ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সের ভোটার রয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭২ জন। জয়-পরাজয়ে এ সংখ্যাটি ভূমিকা রাখবে বলে নির্বাচন বিশ্লেষকদের ধারণা।

জানা যায়, পূর্বে এ আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ৬ বার, বিএনপির ওবায়দুল হক খোন্দকার ও এম এ জিন্নাহ দুইবার করে এবং জাতীয় পার্টির আবু ছালেক একবার নির্বাচিত হয়েছেন।

মিরসরাই উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা নুরুল কবির বলেন, মানুষ অতীতে সব দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। কিন্তু মিরসরাই কিংবা দেশের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এবার সবাই জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিয়েছে। আশা করছি, মিরসরাইবাসী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমানকে বিপুল ভোটে জয়ী করবে, ইনশাআল্লাহ।

উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আজিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিএনপি থেকে ত্যাগী ও মাঠের নেতাকে মনোনয়ন দিয়ে দল সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতদিন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আমরা আলাদা আলাদা গ্রুপ করেছি। ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সব গ্রুপকে নিরসন করে নুরুল আমিন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আমরা মিরসরাইয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করবো, ইনশাআল্লাহ।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যান বলেন, মিরসরাই বিএনপির বিগত ৩০ বছরের ইতিহাসে নির্বাচনকে ঘিরে সকল নেতৃবৃন্দ একসাথে কাজ করছে। এর আগে কোনো প্রার্থীর পক্ষে শতভাগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নজির নেই।

দীর্ঘ ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এবার ভোট দিতে সবাই মুখিয়ে আছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের বিজয় হবে, ইনশাআল্লাহ।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। পুরো উপজেলায় ভোটারদের কাছ থেকে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, আমরা জয়ী হবো, ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, আমি যদি নির্বাচিত হই, মিরসরাই উপজেলাকে একটি টেকসই ও মানবিক উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলবো। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করবো।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার সোমাইয়া আক্তার বলেন, নির্বাচনে মিরসরাই আসনে পোস্টাল ব্যালট রেজিস্ট্রেশন করেছেন ৬ হাজার ৫৭২। পোস্টাল ছাড়া ভোটার হলো ৩ লাখ ৮০ হাজার ১০২টি ভোট। মোট কেন্দ্র ১০৬টি, মোট বুথের সংখ্যা ৭১৮।

১০৬টি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। মিরসরাই থানায় ৪৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ, জোরারগঞ্জ থানার ৫৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের জন্য প্রিজাইডিং অফিসার ১১২ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ৭৩৬ জন, পোলিং অফিসার ১ হাজার ৫০৮ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

Tags :

সর্বশেষ