প্রতি বছর যাতে বন্ড অডিট করতে না হয়, সেজন্য বন্ড অডিটকে একটি সিস্টেমে নিয়ে আসার কথা জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান। তিনি বলেন, এবার বাজেটে আমরা চেষ্টা করবো যত বেশি ডি-রেগুলেট করতে পারি। কারণ বেশি রেগুলেশনের কারণে সময় নষ্ট হয় এবং সময় নষ্টের সঙ্গে ব্যয় জড়িত। আমরা এই জায়গাগুলোতে চেষ্টা করবো, যেখানে যেখানে জটিল পদ্ধতি আছে, সেগুলোকে আমরা সহজ করে দিব। যেমন বন্ড অডিট প্রতি বছর করা লাগে, এটি বড় ধরনের একটা হ্যাচেল। আবার এটাও ঠিক বন্ডে প্রচুর পরিমাণ অনিয়ম হয়, এখনও হচ্ছে। আমরা এই বন্ড অডিটকে একটা সিস্টেমে নিয়ে আসব। যাতে প্রতি বছর বছর অডিট করার প্রয়োজন না হয়। আর যারা বড় বড় ডিফল্টার আছে, তাদের জন্য আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিব।
বৃহস্পতিবার (০৯ এপ্রিল) বিকেলে ৪টায় নগরীর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত প্রাক বাজেট মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য শুল্ক, ভ্যাট ও আয়করসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চেম্বার সদস্যসহ ব্যবসায়ীগণ তাঁদের সুচিন্তিত মতামত, পরামর্শ ও সুপারিশ এনবিআর চেয়ারম্যানের নিকট তুলে ধরেন।
মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্যাক্স ফেরত এবং ভ্যাট ফেরতের ক্ষেত্রে আমরা কঠোর হয়েছি। কারণ হচ্ছে আমরা দেখেছি, বিশৃংখলা দূর করতে হলে একটু কঠোর হতে হয়। আমরা যখন দেখি ব্যবসায়ী তার অ্যাকাউন্টে সহজে ভ্যাট ফেরত পাচ্ছেন না। এটির জন্য উনাকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। আমরা বলেছি আগে এটিকে পরিপূর্ণ অটোমেশন করবো। একজন করদাতা অনলাইনে রিটার্ন সাবমিট করবেন। সেখানে উনার ভ্যাট ক্লেইম করবেন। আমাদের ট্যাক্স অফিস থেকে কর্মকর্তারা সেটি চেক করবেন। সেখানে কোনো গজামিল না পেলে ভ্যাট উনার অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। আমরা ভ্যাটের ক্ষেত্রে এটি করে ফেলেছি। ইনকাম ট্যাক্সের ক্ষেত্রে আমরা কাছাকাছি আছি।
তিনি আরও বলেন, আগে ইনকাম ট্যাক্স কর্মকর্তারা কাস্টসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের তথ্য পেতেন না। একজন করদাতা কি পরিমাণ পণ্য আমদানি রপ্তানি করেছেন ওই তথ্য তারা জানতেন না। এখন আমরা পুরো ডাটার একসেস ইনকাম ট্যাক্স কর্মকর্তাদের দিয়ে দিয়েছি। তাই এখন যদি কোনো করদাতা কি পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে সেটি গোপন করে, তাহলে তিনি ধরা খেয়ে যাবেন। কারণ এখন তার রপ্তানির তথ্য ইনকাম ট্যাক্স কর্মকর্তার কাছে আছে। এভাবে আমরা যদি লিকেজগুলো বন্ধ করতে পারি তাহলে সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে আমাদের কমপ্লায়েন্স করদাতারা। যে কথাটা তারা সব সময় বলে আসেন, আমরা ট্যাক্স দিই, কিন্তু এরপরও সরকার আমাদের ওপর আরও চাপায়। আর যারা দেয় না, তারা কখনই দেয় না।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আবার আমাদের উপর ট্যাক্স বাড়ানোর জন্য প্রছন্ড রকমের চাপ থাকে। যেমন গত বছর আমরা রাজস্ব আদায় করেছিলাম ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। আমাদের বলা হচ্ছে পরবর্তী বছরে ৬ লাখ ৫ কোটি টাকা আদায় করতে। কারণ সরকার যে ধরনের অর্থনৈতিক স্ট্রেন্থ দেখতে চায়, সেই অবস্থা তৈরি করতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তাই সরকার রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে সেটি করতে চান। আমাদেরকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিলেও আমরা চাই, এই রাজস্ব আদায় যাতে যৌক্তিক ও নায্যতার ভিত্তিতে করতে।
মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে তাদের মতামত তুলে ধরেন। সভায় ব্যবসায়ীরা পরিবেশবান্ধব এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নতুন শিল্প স্থাপনে গ্রিন এনার্জি ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য ভ্যাট ও কর ছাড় এবং ইনসেনটিভ প্রদানসহ অন্যান্য সুবিধাদি প্রদান করার পরামর্শ দেন। এটি করা হলে গ্রিন টেকনোলজি গ্রহণে বিনিয়োগকারীগণ উৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ভ্যাট অ্যাক্টের আওতায় আগাম কর (এটি) যদি অতিরিক্ত দেওয়া হয় তা সহজে ফেরত পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের মূলধন দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকে। তাই ব্যবসায়ীদের ক্যাশ ফ্লো সচল রাখার স্বার্থে এই অতিরিক্ত আগাম কর দ্রুত ও সহজে ফেরত প্রদান করা দাবি জানান।
সভায় ব্যবসায়ীদের পক্ষে এক গুচ্চ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক মো. মোতাহার হোসেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকার সাধারণ করদাতাতের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনায় সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করছি। এক্ষেত্রে অধিকাংশ করদাতা ১ম ও ২য় ধাপের মধ্যবর্তী শ্রেণীর, তাই তাদের কথা বিবেচনায় রেখে ১ম ধাপে ৫%-৭.৫% এবং ২য় ধাপে ১০%-১২.৫% করার প্রস্তাব করছি।
অপর প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়াতে হবে তেমনি যারা রাজস্ব যোগান দেন অর্থাৎ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও করদাতাদের বিষয়টিও মাথায় রেখে নিয়মনীতি মেনে যারা নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করছেন তাদের উপর করের বোঝা না বাড়িয়ে করের পরিসর বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
এডভান্স ইনকাম ট্যাক্স নিয়ে তিনি বলেন, এডভান্স ইনকাম ট্যাক্স আমদানি পর্যায়ে কাঁচামালের উপর কর্তন করা হয়। বর্তমান কর কাঠামোতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত “working capital erosion”-এর শিকার হচ্ছে। প্রদেয় এআইটি ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও রিফান্ড প্রক্রিয়া অনেক জটিল এবং আমদানি পর্যায়ে যে এডভান্স ইনকাম ট্যাক্স প্রদান করা হয় তা ট্যাক্সের সাথে সমন্বয় না করে ফাইনাল সেটেলমেন্ট করা হয়। ফলে আমদানিকারকদের জমাকৃত ঢাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
ভ্যাট অডিট প্রক্রিয়া অনেক জটিল জানিয়ে চেম্বার প্রশাসক বলেন, বর্তমানে একটি ফাইল ভ্যাট অডিট করতে প্রায় ৫ বছর সময় লেগে যায়। তাই ভ্যাট অডিটের জন্য একটা আলাদা উইং তৈরি করে দক্ষ ও পেশাদার জনবল নিয়োগ দিয়ে সারা বছর স্বচ্ছতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা হলে ব্যবসায়ীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়াও সহজতর হবে।