চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক চরম অব্যবস্থাপনার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসকদের ‘বিলম্ব’ এবং ‘অনুপস্থিতি’। সকাল ৮টায় হাসপাতালের বহির্বিভাগে টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব রহমত আলী কিংবা দূরপাল্লার বাসে করে আসা কোনো দুস্থ মা—সবার মুখেই এখন একই অভিযোগ: “ডাক্তার কখন আসবেন কেউ জানে না।” সরকারি হাসপাতালে ডিউটি ফাঁকি দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক বা ব্যক্তিগত চেম্বারে সময় দেওয়া যেন এখন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে এই দৃশ্য এখন স্পষ্ট।
সরকারি হাসপাতালের চিত্র: সেবা যেখানে সেকেন্ডারি:
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল কিংবা জেনারেল হাসপাতালের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী আসেন। নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে জুনিয়র চিকিৎসক বা ইন্টার্নদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে সিনিয়র চিকিৎসকরা ব্যস্ত থাকেন ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ডিউটি চলাকালীন অনেক চিকিৎসক বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখেন বা অস্ত্রোপচার করেন। এর ফলে রোগীর ভোগান্তি বাড়ে৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীরা সঠিক সময়ে পরামর্শ পান না। তাদেরকে নানারকম হয়রানির শিকার হতে হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা দিনের আলো শেষ হওয়ার আগেই বাড়ি ফেরার দুশ্চিন্তায় পড়েন।
অব্যবস্থাপনা: চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে অনেক সময় দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে ভাগিয়ে নিয়ে যায়।
বেসরকারি ক্লিনিক ও প্র্যাকটিস মোহ:
বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও চিত্রটা খুব একটা সুখকর নয়। সেখানে নির্দিষ্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট সময় থাকলেও চিকিৎসকরা প্রায়ই এক থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে চেম্বারে আসেন। একাধিক ক্লিনিকে কাজ করার প্রবণতা এবং যাতায়াত বিড়ম্বনার অজুহাতে তারা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি সঠিকভাবে পালন করতে পারেন না। ফলে বেশি টাকা খরচ করেও রোগীদের সেই একই ‘অপেক্ষা’ নামক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে একই হাল।
বিশ্বকলোনী এলাকার চসিকের নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা রোগী হররাম সুলতানা জানান, প্রতিদিন ডাক্তার নয়টায় আসার কথা থাকলেও আসেন ১২টার পর। এতে আমাদেরকে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। একই কথা বলেন, হিলভিউ বার্মা কলোনীর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের রোগীরাও। তারা জানান, সেখানে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন ডাক্তার ঠিকমতো পাওয়া গেলেও সপ্তাহের বাকি সময় আসেন না চিকিৎসক। এছাড়াও ওষুধ না দেওয়া, দুর্ব্যবহারসহ নানা অভিযোগে ভরা এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্র।
পেশাদারিত্বের ঘাটতি ও আয়ের নেশা:
অনুসন্ধানে দেখা যায়, একজন চিকিৎসক চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তিন থেকে চারটি ভিন্ন ভিন্ন ক্লিনিকে রোগী দেখেন। এর ফলে কোনো জায়গাতেই তিনি পূর্ণ মনোযোগ বা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। সরকারি চাকরির ধরাবাঁধা নিয়ম উপেক্ষা করে আয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার এই প্রবণতা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করেন সচেতন মহল। অনেক সময় সরকারি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও চিকিৎসকরা কমিশন বা লাভের আশায় রোগীদের নির্দিষ্ট বেসরকারি সেন্টারে পাঠান।
ভুক্তভোগীদের দাবি:
ভুক্তভোগী রোগীরা মনে করেন, চিকিৎসকদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে কার্যকর তদারকির অভাব। ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা কিংবা ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা না গেলে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবার এই সংকটের সমাধান হবে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মানবিক সেবা। কিন্তু চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে যখন সেবা দেওয়ার চেয়ে সময়ক্ষেপণ এবং অর্থ উপার্জনই মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। সরকারি দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হলে এই হয়রানি থেকে মুক্তির কোনো সহজ পথ নেই।