চট্টগ্রাম বুলেটিন

উত্তরাধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে সময়ের সোপানে: আসিফ আহমদ

চট্টগ্রামের রাজনীতি কোনো দিনই জ্যামিতিক সরলরেখায় চলেনি। এখানকার জোয়ার-ভাটায় যেমন কর্ণফুলীর পাল অলিন্দে অনেক নাম হঠাৎ জেগে ওঠে, আবার মহাকালের গর্ভে নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। এই ভাঙা-গড়ার খেলায় সময় যখন নিজের প্রতিনিধি বেছে নেয়, তখন বংশলতিকার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের আখ্যান। চট্টগ্রামের সমকালীন রাজনৈতিক মানচিত্রে এমনই এক অনিবার্য নাম হয়ে উঠেছেন ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। তার পরিচয়ের প্রথম প্রহরটি শুরু হয়েছিল এক বটবৃক্ষের ছায়াতলে। তিনি সাবেক হুইপ ও চারবারের সংসদ সদস্য প্রয়াত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে যার কন্ঠস্বর এক সময় ছিল পাহাড়ের মতো অটল। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা হলো উত্তরাধিকার কেবল সদর দরজাটা খুলে দেয়, অন্দরমহলে নিজের আসনটি পেতে হয় নিজস্ব মেধা আর ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায়। শাকিলা ফারজানা সম্ভবত সেই অগ্নিপথেরই এক নির্ভীক যাত্রী। রূঢ়

আইনের পরিশীলিত আঙিনা থেকে রাজপথের ধুলোবালি শাকিলা ফারজানার এই রূপান্তর আকস্মিক ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের প্র্যাকটিস কিংবা আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক তৎপরতা তাকে কেবল একজন আইনজ্ঞ হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে গড়ে তুলেছে। ২০০৯ পরবর্তী সময়ে যখন দলীয় রাজনীতি এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল, তখন থেকেই তার সক্রিয়তা দৃশ্যমান হতে থাকে। তবে তার রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০১৫ সালের সেই বিভীষিকাময় অধ্যায়। গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ কারাবাস তাকে কেবল কারারুদ্ধই করেনি, বরং তৃণমূলের কর্মীদের কাছে তাকে করে তুলেছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও সহমর্মী। প্রতিকূলতাই অনেক সময় মানুষকে আড়াল থেকে আলোয় নিয়ে আসে; শাকিলার ক্ষেত্রেও

কারাগারের লৌহকপাট তার রাজনৈতিক দৃঢ়তার স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে সংরক্ষিত নারী আসনকে

ঘিরে চট্টগ্রামের যে নামগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচিত, সেখানে শাকিলা ফারজানা কেবল একটি নাম নন, বরং একটি ‘সম্ভাবনা’র নাম। এটি নিছক কোনো মনোনয়নের দৌড় নয়; বরং দলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং তৃণমূলের আস্থার এক সমন্বিত প্রতিফলন। চট্টগ্রামের মতো সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল জনপদে একজন নারী হিসেবে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করা মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। সেখানে শাকিলা প্রমাণ করেছেন পিতৃপরিচয় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু টিকে থাকতে হয় নিজের কণ্ঠস্বরেই।

শাকিলার শক্তির মূল জায়গাটি হলো আইন ও রাজনীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তিনি যেমন আদালতের ভাষায় ন্যায়বিচার খুঁজতে জানেন, তেমনি রাজপথের ভাষায় জনগণের দাবি আদায় করতেও পিছপা হন না। আধুনিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে এমন শিক্ষিত এবং মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত নেতৃত্বের অভাব আজ প্রকট। বিশেষ করে যখন রাজনীতি কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে মেধাভিত্তিক হয়ে উঠছে, তখন শাকিলা ফারজানার মতো ব্যক্তিত্বরা দলের জন্য এক অপরিহার্য সম্পদ হয়ে ওঠেন। তবে রাজনীতির ইতিহাস বড়ই নির্মম। এখানে উত্থান যেমন দ্রুতি ছড়ায়, পতনও আসে ঝড়ের বেগে। তাই শাকিলা ফারজানার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। উত্তরাধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি কি পারবেন চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নিজের এক স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করতে? তিনি কি কেবল আলোচনার একটি নাম হয়ে থাকবেন, নাকি সময়ের দাবি মিটিয়ে হয়ে উঠবেন আগামীর কাণ্ডারি?

শেষ বিচারে মানুষ নাম নয়, মনে রাখে ভূমিকা। শাকিলা ফারজানার আগামীর পথচলাই বলে দেবে, তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী কোনো স্বাক্ষর রেখে যেতে পারছেন কি না। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক আকাশে যে নতুনের কেতন উড়ছে, শাকিলা ফারজানা সেখানে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হতে পারবেন কি না তা সম

লেখক: কথাসাহিত্যিক

Tags :

সর্বশেষ