চট্টগ্রাম বুলেটিন

সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে বাঘাইছড়িতে মানববন্ধন

মো: হাসান আলী, বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি:

’’পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে’’-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে জাতিগত বৈষম্যের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বাসিন্দারা।

বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ১০টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের উদ্যোগে বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি মো: মোক্তার হোসেন সোহেল এবং সঞ্চালনা করেন উপজেলা যুগ্ম-সম্পাদক আব্দুর রহমান।

এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো: আব্দুল কাইয়ুম। প্রধান বক্তা ছিলেন, বাঘাইছড়ি পৌর শাখার সভাপতি মো: মহিউদ্দিন। এছাড়াও আরও উপস্থিত ছিলেন মো: ইলিয়াস, নুরুজ্জামান, রাফসান হোসেন মাসুদসহ নাগরিক পরিষদের অন্যান্য নেতাকর্মী, বাঘাইছড়ির সর্বস্তরের সাধারণ জনগণ এবং স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা।

বক্তারা বলেন, রাঙামাটি জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে বাঘাইছড়িবাসীর ওপর চরম বৈষম্য করা হয়েছে। স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে উপ-জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নামে-বেনামে নানা ধরনের প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

বক্তারা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, সাজেকের উদয়পুর এলাকায় কফি ও কাজুবাদাম চাষের নামে প্রায় তিন শতাধিক ব্যক্তিকে সাড়ে চার কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ ঐ এলাকায় তিন শতাধিক ব্যক্তি বসবাসই করেন না। বক্তাদের প্রশ্ন—এই প্রকল্পের অর্থ গেল কোথায়?  এছাড়াও সাজেক ইউনিয়নে একটি ঘর, একটি টিউবওয়েল” এবং “সাড়ে চারশ মেট্রিকটন সার” বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক।

বাঘাইছড়ি উপজেলায় মোট আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। বক্তারা অভিযোগ করেন, আমতলী ইউনিয়ন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় সেখানে কোনো ধরনের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। একইভাবে বঙ্গলতলী ইউনিয়নের করেঙ্গাতলী, খেদারমারা ইউনিয়ন, মারিশ্যা ইউনিয়ন ও রূপকারী ইউনিয়নের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় রাস্তাঘাটসহ কোনো ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি।

বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২৯ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, কিন্তু সেই প্রকল্পগুলোর আওতায় বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কোনো উন্নয়ন করা হয়নি। এছাড়াও তারা অভিযোগ করেন, বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের বরাদ্দকৃত বিভিন্ন প্রকল্প গোপনে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দেয়া হয়েছে।

তারা বলেন, মারিশ্যা ইউনিয়নের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় মসজিদ-মন্দিরগুলোকে বঞ্চিত রেখে উপ-জাতীয় বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রকল্প বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বক্তারা জানান, বাঘাইছড়ি নামমাত্র একটি তৃতীয় শ্রেণির পৌরসভা। শুধুমাত্র পৌরসভা হওয়ায় এখানে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন নেই। রাস্তা-ঘাট, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পাবলিক টয়লেটসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে জনগণ বঞ্চিত। অথচ পৌর প্রশাসন কর্তৃক প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা পৌরকর আদায় করা হচ্ছে, কিন্তু নাগরিকরা তার সুফল পাচ্ছেন না। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উপজেলা হওয়া সত্ত্বেও বাঘাইছড়িতে এখনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

বক্তারা আরও অভিযোগ করে বলেন, পাহাড়িদের একটি “চাকরী কল্যাণ সমিতি”কে ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তারা প্রশ্ন তোলেন, “এরকম একটি চাকরী কল্যাণ সমিতিকে কার টাকায় এবং কোন উদ্দেশ্যে এই বরাদ্দ দেয়া হলো?

বক্তারা ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে বলেন— যদি এই প্রকল্পের টাকা প্রত্যাহার না করা হয়, তবে বাঘাইছড়ি উপজেলা থেকে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য দেব প্রসাদ দেওয়ানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে যেকোনো ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে নাগরিক পরিষদ। সেইসঙ্গে বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন, এ অবস্থার দায়ভার তাকেই নিতে হবে। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি ও পাহাড়ি সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বৈষম্য নয়, বরং সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক অংশগ্রহণই হতে হবে পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি, উন্নয়ন ও সহাবস্থানের মূল চাবিকাঠি।”

Tags :

সর্বশেষ