চট্টগ্রাম বুলেটিন

নদভীর ক্যাশিয়ার হত্যা মামলায় কারাগারে, বিএনপি নেতার প্রত্যয়নে জিয়ার সৈনিক

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য দুর্নীতি, অনিয়মসহ জুলাই গণহত্যার অন্যতম আসামি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর ক্যাশিয়ার এস এম আহমদ হোসাইনকে গেল ২৯ জুন ছাত্র-জনতা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পাঁচলাইশ থানার একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় তিনি কারাগারে আছেন৷ এরপর ডবলমুরিং থানা পুলিশ জুলাই আন্দোলনে নিহত শহীদ ইউসুফ হত্যা মামলায় তার সম্পৃক্ততা পেলে তদন্তে প্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে আদালতে৷ দেড় মাস পর সেই তাকেই শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শের সৈনিক দাবি করে লিখিত প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপির ক্যাশিয়ারকে বিএনপি কর্মী দাবি করে প্রত্যয়ন দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠেছে৷ বিএনপিরই একটি অংশ এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের জন্য দলের কাছে দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতা শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন এই প্রত্যয়ন দিয়ে থাকতে পারেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র হত্যাকারী ও হামলার পরিকল্পনাকারী এস এম আহমদ হোসাইনকে বাঁচাতে যেই হীন চেষ্টা মহিউদ্দিন করেছেন তা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানী।

অভিযোগ ওঠেছে, নদভীর ক্যাশিয়ারের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে দলকে উপেক্ষা করে প্রত্যয়ন দিয়েছেন শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন। এভাবে একক সিদ্ধান্তে কাউকে তিনি প্রত্যয়ন দিতে পারেন না। তাছাড়া কেউ যদি বিএনপির কর্মী হয়ে থাকে তাকে কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব যৌথ সাক্ষরে প্রত্যয়ন দেবেন৷

জানা যায়, গত ৯ জুলাই নগরের লালদিঘি এলাকা থেকে টসে এম আহমদ হোসাইনকে পুলিশে সোপর্দ করে ছাত্রজনতা৷ এরপর পাঁচলাইশ থানা পুলিশ তাকে একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়৷ ডবলমুরিং থানাও তার বিরুদ্ধে জুলাইয়ে ছাত্র হত্যা মামলায় তদন্তে সম্পৃক্ততা পায়৷ এরপর থেকে জামিন পেতে নানা চালিয়ে যাচ্ছেন এস এম আহমদ হোসাইন। গত ২৯ জুলাই দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সেক্রেটারি, বর্তমানে জেলা আহ্বায়ক কমিটির এক নম্বর সদস্য শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন একটি প্রত্যয়ন দেন৷ এতে তিনি ব্যতিত আর কারো সাক্ষর নেই। প্রত্যয়নে তিনি উল্লেখ করেছেন, এস এম আহমদ হোসাইন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সক্রিয় সমর্থক ও সহযোগী৷ তিনি ছাত্রজীবন থেকেই জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিনের একান্ত পরিচিত, সৎ, নিষ্ঠাবান ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তিনি রাষ্ট্র বিরোধী কোন কাজে জড়িত নেই বলেও জানান শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন।
তবে তার দেওয়া প্রত্যয়নে এস এম আহমদ হোসাইন বিএনপির কোন শাখার সক্রিয় কর্মী কিংবা ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কোন ইউনিটে কাজ করেছেন তার কোন ব্যাখ্যা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এস এম আহমদ হোসাইন সাতকানিয়ার ইছামতিকুলের বাসিন্দা। তবে তিনি নগরের আন্দরকিল্লার কেবি আমান আলী টাওয়ারে বসবাস করেন। তার বিরুদ্ধে সাবেক এমপি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর প্রভাব খাটিয়ে লালদিঘি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, নারীর শ্লীলতাহানি, চুরি, জমি দখল, প্রতিবেশীকে মারধর, ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতারণা, চাঁদাবাজি, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানিসহ বহু অভিযোগ রয়েছে৷ আহমদ হোসাইন আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত৷

আওয়ামী লীগ আমলে আহমদ হোসাইন নদভীর শহরের বিভিন্ন বিষয় ডীল করতেন৷ তার হয়ে খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নিতেন৷ এলাকায় কোন খাস জমি থাকলে সেটি নদভীকে জানিয়ে আওয়ামী ক্যাডার বাহিনী দিয়ে দখল করে পরে ভাড়া দিতেন৷ এছাড়াও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে অনুপ্রবেশ করে হোসাইন নদভীর প্রভাব খাটিয়ে শালিস ব্যাণিজ্য করতেন৷ সূত্র জানায় মাসে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন করতেন এস এম আহমদ হোসাইন৷ তাকে সেসময় হরহামেশাই নদভীর সাথে দেখা যেতো।

জুলাই আন্দোলন শুরু হলে আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে নিজেই হামলা চালান এস এম আহমদ হোসাইন৷ তার বিরুদ্ধে গত ৫ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা করেন সাবেক মন্ত্রী বিএনপি নেতা আরিফ মঈনুদ্দিনের পরিবার। এজাহারের অভিযোগ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বিএনপি নেতা আরিফ মঈনুদ্দিনের ভাতিজা তারিন মঈনুদ্দিন আন্দোলনকে সমর্থন করে শিক্ষার্থীদের পানি, বিস্কুটসহ খাবার সরবরাহ করে৷ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আহমদ হোসাইন ও মো. শাহজাহান লালদিঘির অরিয়ন টাওয়ার ও আজিম সেন্টারে হামলা করে। এসময় তারা ভবনের কর্মচারী মোক্তারসহ কয়েকজনকে মারধর করে মালামাল লুট করে।

জানা যায়, কারাগার থেকে বের হতে বিএনপি নেতা শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিনের দ্বারস্থ হয়েছেন এস এম আহমদ হোসাইন। এজন্য তার কাছ থেকে একটি প্রত্যয়ন নেওয়া হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। রহস্যজনকভাবে তাকে এখনও রিমান্ডে নেয়নি ডবলমুরিং থানা পুলিশ। উল্টো প্রত্যয়ন নিয়ে বিএনপি কর্মী সেজে জামিনে হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে৷

জানতে চাইলে দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, তার পরিবার বিএনপি পরিবার৷ তাকে জেল থেকে জামিনে আমার জন্য আমি এটা দিয়েছি৷ সে আগে জামায়াত করলেও এখন বিএনপি সমর্থন করে৷ ব্যবসার জন্য নদভীর কাছে তার যেতে হতেও পারে।

এদিকে সাতকানিয়ার নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, রাতারাতি এখন অনেকে বিএনপি বনে যাচ্ছেন৷ এস এম আহমদ হোসাইনকে কোনদিন বিএনপির কোন কর্মসূচীতে দেখা যায়নি৷ তিনি আওয়ামী এমপি নদভীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। যেসব মামলায় তিনি জেলে সেসব যদি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণেও হয়ে থাকে তাহলে দল কেন তাকে প্রত্যয়ন দেবে। দলের নেতা কেন তার জন্য সহযোগিতা করবে?

Tags :

সর্বশেষ