ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেবা সংস্থা ও প্রশাসনিক পদগুলোতে দায়িত্ব পেতে সক্রিয় হয়ে ওঠেছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপি নেতারা৷ আর এক্ষেত্রে সিডিএ (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ নেতাদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। কেউ হতে চান চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক। আবার কেউ হতে চান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান। ইতিমধ্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক হওয়ার দৌড়ে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উত্তর জেলা ও দক্ষিণ জেলার তিন হেভিওয়েট নেতা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত ও উত্তর জেলা বিএনপি সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনকে ঘিরে তৃণমূলের প্রত্যাশা ও আলোচনা এখন তুঙ্গে। অন্য দুজন হলেন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া ও সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই তিন নেতা জেলা পরিষদের প্রশাসক হতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বাসা ও অফিসে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিগত সময়ে দলের জন্য ত্যাগ, মামলা-হামলাসহ স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের হাতে নির্যাতনের বর্ণণা দিয়ে নিজেদের জনসেবার প্রতি আগ্রহের কথাও জানাচ্ছেন৷ নিজ নিজ এ্যাঙ্গেলে সরকার ও দলের উচ্চ পর্যায়ে চালাচ্ছেন লবিং-তদবিরও।
বিএনপি সূত্র জানায়, সন্দ্বীপের মাটি থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেলায়েত হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস এবং বর্তমানে উত্তর জেলা বিএনপির ১নং যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে থাকা বেলায়েত হোসেন বিগত ১৭ বছরে ২৪টি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন এবং চার দফায় প্রায় ১৫ মাস কারাবরণ করেছেন। এছাড়া বিদেশেও দলের কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে কারাবন্দী হয়েছিলেন তৃণমূল থেকে ওঠে আসা এই নেতা। তাঁর এই দীর্ঘ ত্যাগ ও দলের প্রতি অদম্য আনুগত্য তাঁকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে বলে মনে করেন অনেকে।
সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক পত্রিকা মানহানীকর সংবাদ প্রকাশ করলে বেলায়েত হোসেন বাদী হয়ে ১০০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন সেসময়। একদিকে হামলা, মামলায় পুলিশি ভয় অন্যদিকে স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগী সাংবাদিক মহলের রোষানলে বেলায়েতের জীবন তথা রাজনৈতিক ক্যারিয়ার চলে গিয়েছিল চরম ঝুঁকিতে।
এছাড়াও ২০১৪ সালে বেলায়েত হোসেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সন্দ্বীপ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জেলে থাকা অবস্থায় বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন৷ ২০২৬ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন চাইলেও শেষ মুহুর্তে দলের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এসব কর্মকাণ্ড হাইকমান্ডের কাছে তার সাংগঠনিক আনুগত্যের বহি:প্রকাশ হিসেবে ফুটে ওঠতে পারে মনে করা হচ্ছে।
ছাত্রজীবনে ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন ১৯৭৭ সালে সন্দ্বীপের কার্লিল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রতি আগ্রহ থেকে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন৷ সেখান থেকে ১৯৮৫ সালে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন৷ ওইসময় চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন বেলায়েত। পরে তিনি মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
সচেতন মহলের মতে, বেলায়েত হোসেন যেহেতু পেশায় একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, তাই জেলা পরিষদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান হিসেবেও তাঁর নাম জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের পরিকল্পিত উন্নয়নে একজন দক্ষ প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতার যে সমন্বয় প্রয়োজন, তা তাঁর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান বলে অনেকে মনে করেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ যোগাযোগ এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে কেবল একজন নেতা নয়, বরং অভিভাবকসুলভ উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, এই দৌড়ে আলোচনায় রয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া এবং সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন। সাংগঠনিক পরিমণ্ডলে তাঁরা অত্যন্ত পরিচিত মুখ। দক্ষিণ জেলার অনেক নেতাকর্মী মনে করেন ইদ্রিস মিয়া ও লায়ন হেলাল উদ্দিনকে করা হতে পারে জেলা পরিষদের প্রশাসক। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানুষের সাথে সম্পৃক্ততার গুণাবলী দায়িত্বে আসার ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা হিসেবে বিচেচিত হতে পারে।
তবে নগর ও জেলা বিএনপির একাধিক নেতা জানান, বিগত দেড় দশকের রাজপথের লড়াই এবং দীর্ঘ কারাবরণের অভিজ্ঞতার নিরিখে বেলায়েত হোসেনকেই এগিয়ে রাখছেন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা। তৃণমূলের বড় একটি অংশ মনে করছে, চট্টগ্রামের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এবং দলের ত্যাগী কর্মীদের মনে সাহস জোগাতে তাঁর মতো লড়াকু নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বিগত দেড় দশকের দুঃসময়ে রাজপথে থাকা এসব নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে তা তৃণমূলের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হবে। বিশেষ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূলের এই ত্যাগী ও রাজপথের লড়াকু নেতৃত্বের প্রতি সুদৃষ্টি দেবেন—এমনটাই এখন চট্টগ্রামবাসীর মূল প্রত্যাশা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত জেলা পরিষদ বা সিডিএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অর্পণ করার ক্ষেত্রে আন্দোলন ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে বেলায়েত হোসেনই সবচেয়ে এগিয়ে থাকতে পারেন।