রাহাতুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর প্রবেশদ্বারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক শতাব্দী প্রাচীন বিদ্যাপীঠ—বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। স্থানীয়দের কাছে ‘লাল দালান’ হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; বরং এটি চট্টগ্রামের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক। ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি আজ ১০২ বছরে পদার্পণ করে তার সাফল্যের জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। বিদ্যালয়টির পাশে ইউরোপিয়ান ক্লাব, রেলওয়ের প্রাচীন দপ্তর, দেশের একমাত্র রেলওয়ে জাদুঘর ও প্রীতিলতার স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো পুরো এলাকাকে দিয়েছে গৌরবময় পরিচিতি। প্রতিদিন
বিদ্যালয়টির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর দৃষ্টিনন্দন ভবন। দুই তলা বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক লাল দালানের ছাদ আধুনিক স্থাপত্যের তুলনায় বেশ ব্যতিক্রমী—যার নিচতলার ছাদ প্রায় ২০ থেকে ২২ ফুট এবং দ্বিতীয় তলার ছাদ ১২ থেকে ১৪ ফুট উঁচু। ৪.১৬ একরের সুবিশাল ক্যাম্পাসে রয়েছে ২.২৫ একরের বিশাল খেলার মাঠ, যা নগরের যান্ত্রিকতার মাঝে শিক্ষার্থীদের জন্য এক চিলতে সবুজ ফুসফুসের মতো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রাচীন এই বিদ্যাপিঠটি প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে (ব্রিটিশ আমল)। বর্তমানে এটির শিক্ষার্থী সংখ্যা: ৯০০ জনেরও অধিক (৩য় থেকে ১০ম শ্রেণি)। প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান-এর তত্ত্বাবধানে ২৫ জন অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষিকা পাঠ দান করছেন এখানে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত: ১:৩৫ (যা নিবিড় পাঠদানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর)। রয়েছে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা (বাংলা মাধ্যম) বিভাগ।
সাফল্যের পরিসংখ্যান ও ফলাফল
শৃঙ্খলার জন্য সুপরিচিত এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সবসময়ই ঈর্ষণীয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যালয়টি স্থিতিশীল ও ভালো ফলাফল বজায় রেখেছে: ২০২৪ সাল: পাসের হার ৭৭.০১% (২০১ জন উত্তীর্ণ)। ২০২৫ সাল: পাসের হার ৭৭.০৬% (২১৫ জন উত্তীর্ণ)। চলতি বছরসহ সামনের বছরগুলো এই বিদ্যালয় ফলাফলের দিক থেকে নগরীতে শীর্ষে ওঠে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে এমপি সাঈদ আল নোমানের বিশেষ উদ্যোগ:
চলতি বছর ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলে চট্টগ্রামে ১০টি কেন্দ্রে অভিভাবকদের জন্য ছাউনী, পানি, নাস্তার ব্যবস্থা করেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আর নোমান। সেখানে রেলওয়ে স্কুল বিশেষ গুরুত্ব পায়্ এখানেও তার একাধিক টীম কাজ করছে। বাইরে অপেক্ষারত অভিভাবকদের জন্য নিরাপদ খাবার পানি, নাস্তা ও নিরাপদে বসার ব্যবস্থা করেন সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। তার এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

শতবর্ষের মাইলফলক ও প্রাক্তনদের মিলনমেলা
২০২৫ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়টির ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান এবং ইঞ্জিনিয়ার রিয়াসাত সুমনের নেতৃত্বে দুই দিনব্যাপী জমকালো আয়োজনে উদযাপিত হয় শতবর্ষ পূর্তি উৎসব। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘এক্স-স্টুডেন্ট ফোরাম’-এর ব্যবস্থাপনায় সেই মিলনমেলায় ফিরে এসেছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তনেরা, যা এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল।
দেশ গড়ায় অনন্য ভূমিকা
এই বিদ্যাপীঠের প্রাঙ্গণ থেকে পাঠ নিয়ে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা আজ দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আসীন। এখান থেকে তৈরি হয়েছেন জাতীয় নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সরকারের পদস্থ সচিব। এছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, চিকিৎসা, প্রকৌশল এবং সংস্কৃতি অঙ্গনে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরলসভাবে কাজ করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।

আগামীর সম্ভাবনা ও আধুনিকায়ন
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটিকে ‘স্মার্ট স্কুলে’ রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে যা অগ্রাধিকার পাচ্ছে:
স্মার্ট ক্লাসরুম: মাল্টিমিডিয়া ভিত্তিক আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি সম্প্রসারণ।
আইসিটি ল্যাব: উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর কম্পিউটার ল্যাব ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা।
জনবল বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মনোযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষক ও সহায়ক জনবল বাড়ানো।
এক শতাব্দীর ঐতিহ্য এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় পাহাড়তলীর শিক্ষার আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে। লাল দালানের এই উত্তরাধিকার প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে যাবে—এমনটাই বিশ্বাস এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সকলের।
লেখক: প্রাক্তণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবিশ রিপোর্টার