নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম বুলেটিন
বাংলাদেশের সমুদ্র গবেষণা, জলবায়ু পর্যবেক্ষণ এবং সুনীল অর্থনীতির (ব্লু-ইকোনমি) বিকাশে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে দেশের প্রথম ‘স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ফর মেরিন রিমোট সেন্সিং (এসজিএসএমআরএস)’। আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই অত্যাধুনিক কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়।
১০ মিনিটে মিলবে বঙ্গোপসাগরের লাইভ তথ্য
এতদিন বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন তথ্যের জন্য বাংলাদেশকে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতো, যা হাতে পেতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা সময় লেগে যেত। তবে চবিতে স্থাপিত এই নতুন গ্রাউন্ড স্টেশনের কল্যাণে এখন থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই সমুদ্রের রিয়েল-টাইম বা লাইভ তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।
চীন-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ৭০ কোটির প্রকল্প
প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই যুগান্তকারী প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি’। ২০১৯ সালে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হলেও করোনা মহামারির কারণে এর কাজ কিছুটা পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ এর অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয় এবং সফলভাবে কাজ শেষ করে এটি এখন ডেটা সংগ্রহের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
প্রযুক্তির সক্ষমতা ও তথ্য সংগ্রহ
স্টেশনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বমানের ‘এক্স’ ও ‘এল’ ব্যান্ড প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের একাধিক সমুদ্র ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। এর ফলে: সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও বাতাসের বেগ নির্ণয় করা যাবে। ক্লোরোফিলের ঘনত্ব, মেঘের গতিবিধি ও উপকূলীয় অঞ্চলের ভাঙন পর্যবেক্ষণ সহজ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট সূচকগুলো নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করা যাবে।
দুর্যোগ পূর্বাভাস ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রের ডেটা ব্যবহারের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ যেকোনো সামুদ্রিক দুর্যোগের আরও নির্ভুল ও আগাম পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে, যা উপকূলীয় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া, সমুদ্রের ক্লোরোফিল ম্যাপ অ্যানালিসিস করে মাছের ঝাঁকের অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা যাবে, যা দেশের মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব নিয়ে আসবে। অফশোর গ্যাসক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ, খনিজ অনুসন্ধান, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক পর্যটনেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে।
দক্ষ মানবসম্পদ ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
প্রকল্প সমন্বয়ক ও ডাটা সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন জানান, এই কেন্দ্রটি দেশের গবেষকদের স্যাটেলাইট ডেটা হ্যান্ডলিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং এবং বিগ ডেটা অ্যানালাইসিসের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতে একটি ওপেন ডেটা পোর্টাল তৈরি, সমুদ্রে বিশেষ বয়া স্থাপন এবং এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আল ফোরকান এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, “এই গ্রাউন্ড স্টেশন আমাদের সমুদ্র গবেষণার সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাবে। সুনীল অর্থনীতির বিকাশ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে এটি দেশের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।”