Skip to main content

চট্টগ্রাম বুলেটিন

আনোয়ারায় বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল, খুলছে সম্ভাবনা নতুন দুয়ার

৫০০ মিলিয়নের বিনিয়োগ তৈরি হতে পারে বলছেন ব্যবসায়ীরা 

দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক চিত্রে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা শুরু হয়েছে। গত সোমবার শহর লাগোয়া আনোয়ারা উপজেলায় কর্ণফুলি নদীর দক্ষিণ পাড়ে ৭৮৩ একর জমিতে জি টু জি ব্যবস্থাপনায় বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্বোধন হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এই ইকোনমিক জোনের শুভ উদ্বোধন করেন। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগের দুয়ার উন্মোচিত হবে। তাছাড়াও চট্টগ্রামকে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার ঘোষিত সেই বাণিজ্যিক রাজধানীও পূর্ণতা পাবে এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোসহ সমুদ্র নগরী কক্সবাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। চট্টগ্রাম হয়ে ওঠবে মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল তথা নতুন আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব। অন্তত দেড় লাখ মানুষের কর্মস্থান সৃষ্টি হয়ে কর্ণফুলি নদীর দক্ষিণ পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানও পাল্টে যাবে। সেইসাথে কর্ণফুলি নদীর তলদেশের টানেলের ব্যবহার বহুগুণ বাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত আন্তজাতিক বিমানবন্দরের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে জাতীয় অর্থনীতিতে।

 

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে গেলে চায়না ব্যবসায়ীরা তাকে সেদেশের বিনিয়োগের উদ্বৃত্ত বিশাল অংকের অর্থ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চান বলে জানান। তারা প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন এ ব্যাপারে। তারই  ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) চীনা অর্থনৈতিক  অঞ্চল  প্রকল্প  অনুমোদন দেন।  প্রকল্পের আওতায় চীনের  সাংহাইয়ের আদলে কর্ণফুলী  নদীর দুই পাড়ে ওয়ান সিটি টু  টাউনের বাস্তবায়ন আরো ত্বরান্বিত  হবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে  দেড় লক্ষাধিক  মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এরই মাঝে স্থানীয়দের মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে। যেন তারা কর্মসংস্থানের স্বপ্ন বুকে নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণতে শুরু করেছে।

 

সূত্রটি আরও জানায়, আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ  তীরে  প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর এই প্রকল্প করার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষরের পর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) সুবিধার আওতায় বৈদেশিক অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪.২৪ এমএম-সিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন।

আনোয়ারা  উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মহিন উদ্দিন বলেন, পাহাড়, সাগর বেস্টিত  আনোয়ারা  ভৌগলিকভাবেই আন্তর্জাতিক  অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় স্থান। এই প্রকল্প  বাস্তনায়ন হলে  কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহার যেমন বাড়বে তেমনি আনোয়ারা তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স এণ্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, আমাদের মোট বিনিয়োগের দুই তৃতীয়াংশ আসে চায়না থেকে এবং মাঝারি ও বড় বিনিয়োগগুলো চীনের ব্যবসায়ীরা করেন। চীনের কুনমিং থেকে তারা চট্টগ্রাম বন্দরে একটি সড়ক করতে চায়। এছাড়াও টানেল থেকে কক্সবাজারে আরেকটা সড়ক হবে। ফলে কক্সবাজারে দূরত্ব কমে আসবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামেও চীন সড়ক বানাতে চায়। সুতারাং গত ২০ বছরে চীন যেভাবে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশও সেই পথে আগাবে। বাংলাদেশ আশিয়ানের সদস্য দেশ হতে পারে। এই অঞ্চল সেই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে দেবে। চেম্বার সভাপতি আরও বলেন, সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী এই অর্থনৈতিক অঞ্চল সফলভাবে বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। আমি মনে করি এটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। পুরো এলাকাটি মুক্ত বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে খ্যাত হয়ে ওঠবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের কক্সবাজারেও এর সূদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে। সেখানকার মানুষের জীবনমানও পাল্টে যাবে।

 

আনোয়ার উপজেলাকে এই প্রকল্পের সবচেয়ে উপযোগী স্থান উল্লেখ করেন তিনি বলেন, কর্ণফুলি টানেলের ব্যবহার যেমন বাড়বে তেমনি বন্দর ও বিমানবন্দরের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা চাইব এটি দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। তাহলেই খালেদা জিয়ার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে। অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠবে চট্টগ্রাম।

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম  বলেন, আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক জোন নির্মাণ আনোয়ারার জন্য বড় আর্শীবাদ। এই এলাকার  শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি  হবে এবং বেকারদের কর্মসংস্থান হবে। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। সর্বোপরি দেশের উন্নয়ন হবে।

 

Tags :

সর্বশেষ