নুর নবী রবিন
বাঁশের কয়েকটি খুঁটির ওপর কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে একটি ত্রিপলের ছাউনি। কালচে-নীল সেই ত্রিপল টেনে বৃষ্টির পানি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন ঘরহারা মানুষ। ভেতরে তখনও জমে আছে হাঁটুসমান কাদা, আর সেই কাদার নিচে চাপা পড়ে আছে ভাঙা খাট, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাব আর একটি সংসারের সঞ্চিত জীবন। সাম্প্রতিক বন্যার পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালির বিভিন্ন ইউনিয়নে এখন এটাই বাস্তবতা। পানি নেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছে ধ্বংসস্তূপ আর অনিশ্চয়তা।
চলতি মৌসুমের টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট এই বন্যা চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে দশ লাখের বেশি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রাণহানির সংখ্যাও কম নয়; বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চল্লিশের ওপরে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে বহু পরিবার দীর্ঘদিন পানিবন্দী থেকেছে। পানি নামার পরও এসব এলাকায় ঘরবাড়ি, ফসল আর জীবিকার যে ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা মোকাবিলার সামর্থ্য নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলোর নেই।
দুর্যোগের তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলানোর পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুনর্বাসন। অথচ মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, ত্রাণ কার্যক্রমই এখনো পর্যাপ্ত নয়। কোথাও কোথাও একটি পরিবারের ভাগ্যে জুটেছে মাত্র দেড় কেজি চাল, যা কয়েক দিনের খাবারের জন্যও যথেষ্ট নয়। ঘরহারা মানুষ এখনো ত্রিপলের ছাউনির নিচে দিন কাটাচ্ছেন, কাদা সরিয়ে বসতঘর মেরামতের সামর্থ্য তাদের নেই। এই পরিস্থিতিতে সাময়িক ত্রাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচি।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কথা বলা হচ্ছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের মতো সংস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু শুধু তালিকা তৈরি বা পরিদর্শন যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন বাস্তবায়নের গতি। যাদের ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, তাদের জন্য দ্রুত অস্থায়ী নিরাপদ আশ্রয় ও পরবর্তীতে স্থায়ী গৃহনির্মাণ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দরকার কৃষকদের জন্য বীজ, সার ও কৃষি ঋণের ব্যবস্থা, যাতে নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে তারা আবার মাঠে ফিরতে পারেন।
কাদাপানিতে দীর্ঘদিন ডুবে থাকা এলাকাগুলোয় স্বাস্থ্যঝুঁকিও উপেক্ষার সুযোগ নেই। পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত মেডিকেল টিম ও ওষুধ সরবরাহ প্রয়োজন প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নে। এর পাশাপাশি ভাঙা রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা দ্রুত মেরামত না হলে সামনের বর্ষায় একই দুর্ভোগ ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে। জলকপাট ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি বা অবহেলার কারণে বন্যার ভয়াবহতা বেড়েছে বলে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোরও স্বচ্ছ পর্যালোচনা হওয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যতে এমন মানবসৃষ্ট কারণে দুর্যোগ আরও ভয়াবহ না হয়।
পুনর্বাসন কোনো একবারের কর্মসূচি নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া—যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রকৃত তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই প্রকৃত অর্থে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। নইলে সাহায্যের নামে বরাদ্দ হওয়া অর্থ ও সামগ্রী প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে না পৌঁছে মাঝপথে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়, যা অতীতের অভিজ্ঞতায় বারবার দেখা গেছে।

যে মানুষগুলো আজ ভাঙা ঘরের কাদা সরিয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াই করছেন, তাদের প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়—প্রয়োজন মাথার ওপর একটি স্থায়ী ছাদ, সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় আর জীবিকা ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা। চট্টগ্রামের প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, সর্বোপরি সরকারের কাছে এখন সময়ের দাবি একটাই—পুনর্বাসন প্রক্রিয়া যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ নেয়, এবং তা যেন হয় দ্রুত, সমন্বিত ও দীর্ঘস্থায়ী।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক