চট্টগ্রাম বুলেটিন

আত্মহত্যা ছাড়া আমার উপায় নেই: ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী

চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় বালু মহালে চাঁদাবাজির আধিপত্যকে কেন্দ্র করে জোড়া খুনের মামলায়ও হুকুমের আসামি হয়েছেন ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্না শারমিন। আর এ খবরে আত্মহত্যা ছাড়া উপায় নেই বলে জানিয়েছেন তামান্না শারমিন।

বুধবার (২ এপ্রিল) বিকালে জোড়া খুনের মামলায় আসামি হওয়ার বিষয়টি প্রতিক্রিয়া চাইলে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমি একজন ২ মাসের সন্তান সম্ভবা। এর আগে আমার গর্ভের সন্তানকে হারিয়েছি। ওসি আরিফ আমাকে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে। আমার স্বামীকে না পেয়ে সে আমাকে ধরে। এরপর পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় আদালতে পাঠায়। আদালত আমাকে দ্রুত সময়ে জামিন দেন। কেননা আমি ছিলাম গর্ভবতী।

তিনি বলেন, আমাকে অকারণে হয়রানি করে মানসিকভাবে যন্ত্রণায় রাখা হচ্ছে। আমার শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না। আমার স্বামী ২১ দিনের রিমান্ডে আছে ডিবি অফিসে। এই ঈদেও তাকে কোন খাবার দিতে দেয়নি। আমি বারবার ডিবি অফিসে ঘুরেছি, আমার সাথে দেখা করতে দেয়নি। তাহলে তার পক্ষে কোন তথ্য সরবরাহ করা কি করে সম্ভব? ধরে নিলাম আমার স্বামী সন্ত্রাসী, কিন্তু আমি কি দোষ করেছি। আমিও কি সন্ত্রাসী। আমি একজন শিক্ষিত মেয়ে। আমার মা অসুস্থ, আইসিইউতে আছেন। আমি তাকে দেখতেও সেখানে যেতে পারছিনা। আমার স্বপ্ন আমি একজন আইনজীবী হব। সামনে বার কাউন্সিলের পরীক্ষা আছে। পড়াশোনাও করতে পারছিনা। আমাকে মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমার অপরাধ আমি একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। সব গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে আমার স্বামীকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ায় নাকি প্রতিশোধ নিয়েছি আমরা। আমার স্বামীকেতো সরোয়ার ধরিয়ে দেয়নি। ধরিয়ে দিয়েছে সূচী নামে এক মেয়ে। বালু মহালে বড় সাজ্জাদ ও সরোয়ার ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সেখান থেকে এই ঝামেলার সৃষ্টি হয় বলে আমি জানতে পারি। তিনি বলেন, কেউ আমার বিষয়টি নিয়ে একটু লিখছেনা, যাচাই-বাছাই করা ছাড়া সবাই আমাকে দোষ দিচ্ছে। আমাকে এ নিয়ে ৩টি মামলার আসামি করা হয়েছে। একটি চাঁদাবাজি, একটি পুলিশের কাজে বাধা, আরেকটি জোড়া খুন। কোনটিতে আমার ও আমার স্বামীর সম্পৃক্ততা নেই। কোন কলরেকর্ড নেই। ওসি আরিফ ও সন্ত্রাসী সরোয়ার আমার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে।

জানা যায়, গত ২৯ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোড়ে প্রাইভেটকারে ‘ব্রাশফায়ার’ করে দুজনকে খুন করা হয়। এর দুই দিন পর সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানায় মামলা হয়েছে। এতে সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও ৬-৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় নিহত বখতিয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম বাদী হয়ে নগরীর বাকলিয়া থানায় এ মামলা করেন। এর আগে ২৯ মার্চ রাতে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোড়ের রাজাখালি ব্রিজের সামনে গোলাগুলি হয়। ওই গোলাগুলি চকবাজারের নবাব সিরাজদ্দৌলা রোড় পর্যন্ত গড়ায়। এতে ২ জন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন আরও দুইজন।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার উদ্দিন বলেন, মামলায় মো. সাজ্জাদ, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নাকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। এতে আসামি করা হয় মোহাম্মদ হাছান, মোবারক হোসেন ইমন, খোরশেদ, রায়হান ও বোরহানকে। তাছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন বাবলার গাড়ি চালক ছিলেন মানিক আর ব্যক্তিগত কাজ দেখাশোনা করতেন আবদুল্লাহ। গত ২৯ মার্চ রাতে একটি প্রাইভেটকারে তারা নগরের নতুন ব্রিজ এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলেন।

আড্ডা দিয়ে তারা রাত ২টায় বাড়ি ফেরার সময় রাজাখালী ব্রিজে পৌঁছালে ছয়-সাতটি মোটরসাইকেল থেকে প্রাইভেটকার লক্ষ্য এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়। গুলিতে গাড়ির পেছনের গ্লাস ঝাঝরা হয়ে যায়। এতে মানিক গুলিবিদ্ধ হন। ওই অবস্থায় মানিক বহদ্দারহাটের দিকে না গিয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোড দিয়ে চকবাজারের দিকে চলে যান। তখন মোটরসাইকেলগুলো তাদেরকে পেছনে ধাওয়া করে।

রাত সোয়া ২টার দিকে চকবাজার থানার নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কে মানিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ি থামালে ধাওয়া করা মোটরসাইকেল থেকে হাছান, ইমন, বোরহান, খোরশেদ, রায়হানসহ অজ্ঞাতপরিচয় ছয়-সাতজন তাদের হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করেন। গুলিতে মানিক ও আবদুল্লাহ, হৃদয় ও রবিন জখম হন। গাড়িতে থাকা সারোয়ার ও ইমন কৌশলে নেমে যান। এরপর গুলি ছুড়তে থাকা ব্যক্তিরা পালিয়ে যান। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মানিক ও আবদুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন। রবিন ও হৃদয় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, আসামি সাজ্জাদ এবং তার স্ত্রী তামান্নার পরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা সারোয়ার হোসেন বাবলা ও অন্যদের হত্যার জন্য নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে প্রাইভেট কারটির পিছু নেন। গুলিতে আহতদের আত্মীয়দের সন্দেহ সরোয়ার হোসেন বাবলাকে টার্গেট করে করেই প্রতিপক্ষ ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা ওই গাড়িতে হামলা চালায়।

গত ২৯ জানুয়ারি ফেসবুক লাইভে এসে সাজ্জাদ বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমানকে পেটানোর হুমকি দেন। পরদিন সাজ্জাদকে ধরতে নগর পুলিশ কমিশনার পুরস্কার ঘোষণা করেন। তার বিরুদ্ধে ১৬টি হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে।

১৫ মার্চ সাজ্জাদকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিএমপি। এরপর তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না লাইভে এসে গ্রেপ্তারে জড়িতদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। একইসাথে তিনি কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে স্বামীকে মুক্ত করে আনার কথা বলেন। যদিও তামান্না দাবি পুলিশ সেই ভিডিও তাকে দিয়ে জোর করিয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছে।

Tags :

সর্বশেষ