চট্টগ্রাম বুলেটিন

কৃষকদল নেতা হত্যা মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের ৪ নেতাকে ফাঁসানোর অভিযোগ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষকদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দীন হত্যা মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩ নেতা ও যুবদলের ১ নেতাসহ ৪ জনকে থানায় চা খাওয়ার কথা বলে ডেকে এনে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় রাতভর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা থানায় অবস্থান করলেও শনিবার ভোরে তাদেরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ।

এদিকে ৪ নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা টক অব দ্য সীতাকুণ্ডে রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে হাটবাজার সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। গ্রেপ্তারদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদেরকে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারদের কয়েকজন হত্যার ঘটনার সময় বিভিন্ন এলাকায় ইফতার মাহফিলে ছিল। কোন ধরণের যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

থানা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার (২৭ মার্চ) সন্ধ্যার পর চা খাওয়ার কথা বলে একে একে ৪ জনকে ডেকে নেয় তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড থানার এসআই মো. রাসেল। এরপর তাদেরকে সরাসরি হাজতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এরা হলেন, মামলার ২ নম্বর আসামি মো. বশির (৩৫), ৩ নম্বর আসামি মো. আনোয়ার হোসেন (৩৩), ৭ নম্বর আসামি আরমান শাকিল (৩০), ৮ নম্বর আসামি রাসেল (৩৮)। এদের মধ্যে বশির বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সেক্রেটারি, আনোয়ার হোসেন উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য, আরমান শাকিল মুরাদপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকদলের সদস্য সচিব।

এজাহারে অন্য আসামিরা হলেন, উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের হাতিলোটা মাহমুদাবাদ গ্রামের নুরুল আলম নুরুর ছেলে মোঃ এমরান (৪৫) ও মোঃ সুজন (২৮), বাড়বকুণ্ড এসকে এম চৌধুরী পাড়া এলাকার মৃত নুর হোসেনের ছেলে মোঃ শাহিন (২৬) ও মুরাদপুর হাসনাবাদ গ্রামের মোহাম্মদ লাতুর ছেলে সাহাব উদ্দিন (৩৬)। তাদের মধ্যে এমরান ছাড়া বাকিরা স্বেচ্ছাসেবকদল ও যুবদলের নেতা বলে জানা গেছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের হাতিলোটার বাসিন্দা নাসির উদ্দীন গরুর খামারের ব্যবসা করতেন। গত ২৬ মার্চ সন্ধায় ইফতারের পর মোটরসাইকেল যোগে প্রতিবন্ধী ছেলে নাফিজ উদ্দিনকে নিয়ে শপিং করার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এসময় হাতিলোটা বোচার নতুন বাড়ির সামনে পূর্ব পাশের কালভাটের উত্তর পাশে রাস্তা অতিক্রম করার সময় সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেল থামিয়ে ছেলে নাফিজকে (প্রতিবন্ধী) মোটরসাইকেল হতে নামিয়ে একটি চকলেট দিয়ে বাড়ির দিকে চলে যেতে বলে। কিন্তু ছেলে বাড়ি না গিয়ে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছিল। তখনই ধারালো রামদা দিয়ে কুপিয়ে নাসিরের ডান পাশের গালে ও ঘাড়ে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। রামদার কুপে থুতনী হতে ঘাড়ের পেছনে বাম কান পর্যন্ত এক-তৃতীয়াংশ কেটে যায়। পরে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। আরও জানা যায়, আসামিদের সাথে নাছিরের বেশ কিছুদিন আগে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

এসআই মো. রাসেল জানান, পুরো হত্যাকাণ্ড এলাকায় মাদকসহ বিভিন্ন ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে সংঘটিত হয়েছে। আমরা তাদেরকে গ্রেপ্তারে একটি কৌশল অবলম্বন করতেই পারি। তাদের বিরুদ্ধে নিহত নাছির উদ্দীনের স্ত্রী মোমেনা আক্তার বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলায় ৮ জনকে নাম উল্লেখ করে ও ৫-৬ জনকে অজ্ঞাাতনামা আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ৪ জনই এজাহারভুক্ত আসামি। কোন ক্লুতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

জানা যায়, মামলার ১ নম্বর আসামি ইমরান হোসেন একজন শীর্ষ মাদককারবারী৷ তার বাড়ি নিহত কৃষকদল নেতা নাছির উদ্দীনের বাড়ির পাশে বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের হাতিলোটা গ্রামের ছরারকুলে। তার সাথে নাছির উদ্দীনের বিরোধ রয়েছে। পুলিশ তাকে খুঁজছে। উচ্চতায় ৬ ফুট লম্বা ইমরান ঘটনার দিন এলাকার একটি কৃষি জমিতে লুকিয়ে ছিলেন বলে জানান স্থানীয়রা। নাছির উদ্দীনকে হত্যার সময় দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

গ্রেপ্তার স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আনোয়ার হোসেনের ভাই জামশেদ উদ্দিন বলেন, আমার ভাই ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে হযরত ইয়াছিন শাহ মাজারে একটি ইফতার মাহফিলে ছিল। সেখানের ভিডিও ফুটেজ আছে। কোন ধরণের যাচাই-বাছাই ছাড়াই পুলিশ আমার ভাইকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দেয়। তাকে চা খাওয়ার কথা বলে ডেকে আনা হয়। তিনি রাজনৈতিক গ্রপিংয়ের ষড়যন্ত্রের শিকার। তিনি আরও বলেন, দলের ভেতরের একটি পক্ষের সাথে তার ভাইয়ের দ্বন্দ্ব ছিল। সেজন্য নাছিরের স্ত্রীকে ডাইভার্ট করে ৮ জনের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে কল্পনাপ্রসূত আসামি করা হয়েছে। তারা ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত নয়।

গ্রেপ্তার হওয়া যুবদল নেতা মো. রাসলের ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার ভাইয়ের সাথে বিএনপির কিছু নেতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেগুলো কোন ব্যবসা-বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব নয়। শুধু সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব কিংবা ভুল বুঝাবুঝি। আর নাছির আমার ভাইয়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। অথচ তাকে হত্যার মামলায় আমার ভাইকে গ্রেপ্তার দেখানো হলো। তিনি আরও বলেন, হত্যাকারীরা হত্যা করে কি বাজারে ঘুরবে? ডাকলে থানায় চলে আসবে? যে হত্যাকারী সেতো আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াবে। এখানে রাজনৈতিক কোন্দলের শিকার হলেন গ্রেপ্তাররা।

তিনি আরও বলেন, বিগত দিনে বহু মামলায় দফায় দফায় কারাগারে ছিল গ্রেপ্তার ৪ জন। আজ এই দিনে ঈদুল ফিতরের আগে তারা মিথ্যা মামলায় জেলে। এটি প্রকৃত হত্যাকারীকে আড়াল করার একটি চেষ্টা। যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা আইনী লড়াই করে মুক্তি পাবে কিন্তু আসল খুনী পার পেয়ে যাবে।

 

এদিকে সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা বিএনপির নিবেদিত প্রাণ। বিগত সময়ে মামলা হামলার শিকার হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ি ছাড়া ছিলেন তারা। বহু জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ পথ হারিয়েছেন ব্যবসা-বাণিজ্য পড়াশোনা চাকরির সবই। সে তারাই আজ নিজ দলের কর্মী খুনে জেলে যেতে হলো। তাদের প্রশ্ন, ৪ জন আসামিই কি একই কৌশল অবলম্বন করে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে। মামলা হতেই কেন গ্রেপ্তার করা হলো? পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে পারতো।

এর আগে গত ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের হাতিলোটা গ্রামের সড়কের উপর নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও জবাই করে তাকে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় ও নাছির উদ্দীনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন ইফতারের পর ছেলে নাফিজকে সাথী করে নাছির উদ্দীন ২ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বের হন। সেদিন তার সাথে একটি পক্ষের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক ছিল। কিন্তুু বৈঠকের আগেই তাকে পথিমধ্যে হত্যা করা হয়।

তার স্ত্রী রোমানা আক্তার ২৭ মার্চ বিকালে জানান, তিনি কাউকে চিহ্নিত বা সন্দেহ করেনি। কারা ঘটনার সাথে জড়িত তাও তার জানা নেই। তবে মাটি ব্যবসা ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে তার সাথে বিরোধ চলছিল। ওইদিন সেই বিরোধ মিটিয়ে দিতে ঘর থেকে ২ লাখ টাকা নিয়ে বের হন নাছির উদ্দীন। টাকাগুলো একা সামাল দিতে পারছিলেন না বলে ছেলেকেও সাথে নেন। তিনহ আরও জানান, নাছির উদ্দীন একজন খামারী হলেও ১ মাস আগে তিনি মাটি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় একটি পুকুর থেকে তিনি মাটি কেটে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছিলেন। অপর একটি পক্ষ তার কাছে প্রতি ট্রাকে কমিশন দাবি করে। রোমানা আক্তার বলেন, স্থানীয় জামাল হুজুরের ছেলে আজাদ ও আরেক বাসিন্দা আবছার তার সাথে মাটি ব্যবসার অংশিদার ছিলেন।

জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড থানার (ওসি) মো. মজিবুর রহমান বলেন, নিহত নাসির উদ্দীনের স্ত্রী ৮ জনকে আসামী করে খুনের মামলা দায়ের করেছেন। তাদের মধ্যে চারজনকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করে শনিবার (২৯ মার্চ) সকালে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার জানা নেই তারা কোন দলের কর্মী কিনা? মামলায় আসামি করাতে আমরা গ্রেপ্তার করেছি।

 

 

Tags :

সর্বশেষ