চট্টগ্রাম: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দুপুর গড়াতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে গর্জে উঠেছিল সমগ্র চট্টগ্রাম। পতন ঘটেছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের, হেলিকপ্টার যোগে গণভবন থেকে দেশ ছেড়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজপথে নেমে এসেছিল লাখো ছাত্র-জনতা। ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা আর শোককে কাটিয়ে বন্দরনগরীর আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছিল বিজয়ের উল্লাসে।
নিউমার্কেট মোড়: প্রতিরোধের প্রাণকেন্দ্র থেকে বিজয়ের মঞ্চ জুলাই আন্দোলনের পুরোটা সময়জুড়ে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট মোড় ছিল প্রতিরোধ ও সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্তও সেখানে ছিল থমথমে উত্তেজনা। কিন্তু দুপুরের পর যখন সরকারের পতনের খবর নিশ্চিত হয়, তখন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো চারপাশের গলি ও রাজপথ থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে আছড়ে পড়ে নিউমার্কেট চত্বরে। জাতীয় পতাকা হাতে যুবক, প্রবীণ ও নারীরা নেমে আসেন রাস্তায়। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন অনেকেই—যে কান্না ছিল হাজারো শহীদের ত্যাগের পর পাওয়া স্বস্তির।
কাজির দেউড়ি: কাজের দেউড়ি সেদিন চারপাশ থেকে
মানুষ সড়কে নেমে আসে। ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পলায়নের খবরে লাখো জনতা উল্লাস করতে থাকে। পুলিশের একটি দলকে ধাওয়া দিয়ে সার্কিট হাউজে ঢুকিয়ে পেলেও ছাত্র-জনতা। গায়ের পোশাক খুলে সেদিন নিলিপ্তভাবে প্রাণে বেঁচে ছিলেন ওইসব পুলিশ সদস্য। চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী
থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ বিক্ষোভের পাশাপাশি স্বৈরাচারের পতনে উল্লাসে মেতে উঠেন। বিপরীতে পালাতে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
বহদ্দারহাট থেকে জিইসি: বিজয়ের দীর্ঘ মিছিল নিউমার্কেটের পাশাপাশি আন্দোলনের অন্যতম রক্তস্নাত এলাকা বহদ্দারহাটেও সেদিন নেমেছিল জনতার ঢল। যে বহদ্দারহাটে কয়েকদিন আগেই ঝরেছিল তাজা প্রাণ, সেই রাজপথেই সেদিন ধ্বনিত হয় জয়ের গান। মিছিলের পর মিছিল এসে মিশেছিল জিইসি, লালখান বাজার ও ওয়াসা মোড়ে। রিকশা, বাইক, ট্রাক—যে যেভাবে পেরেছে চড়ে বসেছে, হাতে ছিল লাল-সবুজ পতাকা। মিষ্টি বিতরণ আর স্বৈরাচার পতনের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো নগরী।
বড় পোল:
বিকাল ৪টা পর্যন্ত নগরের বড় ফল এলাকায় সেদিন হাজারো জনতা ভিড় করে। একাধিক এস্কেভেটর দিয়ে মুজিবের মূর্তি ভাঙার উল্লাসে মেতে উঠে নগরবাসী। শত শত মানুষ মুঠোফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করে। কেউ কেউ শেখ মুজিবের মাথায় উঠে মূত্র ত্যাগ করে। বিকেল গড়াতেই বিভিন্ন স্থাপনায় শেখ মুজিবের ভাস্কর্য, হাসিনার ছবিসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ব্যানার, বিলবোর্ড, অফিস, চাঁদাবাজির কেন্দ্রগুলো পুড়িয়ে দিতে থাকে জনতা। এক কথায় ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের আগে থেকেই পুরো শাসনব্যবস্থা জনগণের হাতে
হস্তান্তর হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের শিকল।
শোক আর বিজয়ের মিশ্র অনুভূতি সেদিনের সেই বিজয়ের উল্লাসের পেছনে ছিল এক গভীর বেদনার ইতিহাস। ওয়াসার মোড় থেকে শুরু করে সিআরবি, ষোলশহর কিংবা চবি ক্যাম্পাস—প্রতিটি ইটের কণে লেগেছিল শহীদদের রক্তের দাগ। বিজয়োল্লাসে নামা মানুষের কণ্ঠে তাই বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি ছিল শহীদ ওয়াসিম, হৃদয় কিংবা শান্তদের হারানোর তীব্র শোক।
৫ আগস্টের সেই অপরাহ্ণ ছিল চট্টগ্রামের জন্য এক নতুন ভোরের প্রতীক। স্বৈরাচারের ভয়াল কালো ছায়া কাটিয়ে একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে সেদিন এক হয়েছিল পুরো বন্দরনগরী।