চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মনজুর আলম সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে একটি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। আকবর শাহ এলাকার বাগান বাড়ী আবাসিক এলাকায় ‘বেগম খালেদা জিয়া অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে এই প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও এই নতুন উদ্যোগকে ঘিরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সচেতন মহল বলছেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলম যা করেন সবই লোক দেখানো। নিয়তে গড়মিলের মধ্যে কোন ফজিলত নেই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শেখ মুজিব নিয়ে বক্তব্য ও রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড:
বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা বহুদিনের। তিনি পূর্বে এক বক্তব্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘আল্লাহর অলি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় তিনি নিজেকে ও তাঁর পরিবারকে আওয়ামী অনুরাগী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, তাঁর পরিবার একটি আওয়ামী পরিবার এবং ছোটবেলা থেকেই তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবেসে এসেছেন।
দখলদারিত্ব ও সিডিএর অভিযান সংক্রান্ত বিতর্ক
এর আগে চট্টগ্রামের আউটার রিং রোড এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে শেখ রাসেলের নামে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করেছিলেন মনজুর আলম। আওয়ামী লীগ আমলে নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি শেখ হাসিনাকে দিয়ে অনলাইনে উদ্বোধন করান মনজুর আলম। ওই সময় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাসির উদ্দিন তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন। পরে গত বছরের শেষ দিকে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড স্টেডিয়ামটি উচ্ছেদ করে।
এ ছাড়া বায়েজিদ লিংক রোডে মাইজভান্ডারি তোরণের নামে একটি প্রবেশদ্বার তৈরি করে মোস্তফা হাকিম গ্রুপের বিজ্ঞাপন প্রচারের ঘটনা ঘটান তিনি। পরবর্তীতে গণমাধ্যমে বিষয়টির খবর প্রকাশিত হলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) অভিযান চালিয়ে সেই তোরণ ও অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেয়।
বারবার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন ও সমালোচনা:
চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিকদের মতে, মনজুর আলমের রাজনীতিতে সময় ও সুযোগ বুঝে রূপ পরিবর্তনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং পরবর্তীতে নতুন গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ নানা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সান্নিধ্যে আসার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এনসিপির হয়ে তিনি চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জনও রটেছে। এছাড়া এনসিপির বিভিন্ন কর্মসূচীতে তাকে পানিসহ খাবার সরবরাহ করতে দেখা গেছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহর সফর ও বিএনপি নেতাকর্মীদের ক্ষোভ: সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এবং কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ মনজুর আলমের বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে মনজুর আলমের বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং হাসনাত আব্দুল্লাহকে কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখেন।
বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা প্রশ্ন তোলেন, জুলাই বিপ্লবের একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা কীভাবে একজন ‘স্বৈরাচারের দোসর’ ও রাজনৈতিক ডিগবাজি খাওয়া নেতার বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারেন? এই ঘটনাকে ঘিরে বর্তমানে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে এম মনজুর আলম চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে জয়লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করার ইচ্ছা পোষণ করেন। শেখ হাসিনাকে খুশি করতে শেখ রাসেল, শেখ কামালের নামে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলে লোক দেখানো কর্মসূচি চালু রেখেছিলেন তিনি। যা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতেও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের আমি-ডামি নির্বাচনেও তিনি ফুলকপি মার্কায় চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে একতরফা ভোটে আওয়ামী লীগের মহিউদ্দিন বাচ্চুর কাছে পরাজিত হন। ৫ আগস্টের পর খালেদা জিয়ার কবর জেশারত, মেজবানী, টানা মিলাদ মাহফিল করে আলোচনায় আসেন সমালোচিত এই ব্যবসায়ী। তার ভাতিজা দিদারুল আলম চট্টগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগের টিকেটে দুইবার এমপি নির্বাচিত হন। মোস্তফা হাকিম গ্রুপ নামে তাদের এইচএম স্টিল, শিপইয়ার্ড, মোস্তফা হাকিম সিমেন্ট, হাসপাতালসহ বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।