চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইদ্রিস আলী (৫০) নামের আরও এক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এতে চাঞ্চল্যকর ওই দূর্ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইদ্রিস আলী। নিহত ইদ্রিস আলীর বাড়ি জামালপুর জেলায়।তবে বিষয়টি আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে আসে। এদিন সকালে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে জামালপুরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, গত ১৪ আগস্ট সকালে দূর্ঘটনার পর থেকেই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ইদ্রিস আলীকে নগরীর ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। দীর্ঘ ছয় দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর বুধবার সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ন্যাশনাল হাসপাতালের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. ফারুক জানান, দুর্ঘটনার পর থেকেই ইদ্রিস আলী হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য দপ্তরকে যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সাগর উপকূলে অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে’ স্ক্র্যাপ জাহাজ ‘এমটি রাসি’র ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন শ্রমিকেরা। এতে ঘটনাস্থলে ৫ জন পরে হাসপাতালে ৪ জনসহ মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন আরও ছয়জন। ইদ্রিস আলীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ১০ জনে দাঁড়াল।
কার্যক্রম বন্ধ, তদন্তের অগ্রগতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা:
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর ‘বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড’ ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের সব ধরণের কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যে দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একাধিক তদন্ত দল কাজ শুরু করছে।
প্রাথমিকভাবে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের কারণে এই প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দূর্ঘটনার চার দিন পর মঙ্গলবার সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে জাহাজের বাতাসে নতুন করে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাননি তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তদন্তের স্বার্থে বিশেষজ্ঞরা বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা পরীক্ষা করতে জাহাজের বাতাস, মাটি ও রাসায়নিকের নমুনা সংগ্রহ করেছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, পরিদর্শনে বিলম্ব হওয়ার কারণে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস বাতাসের সাথে মিশে সরে যেতে পারে কিংবা জোয়ারের পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যেতে পারে। অক্ষত ট্যাংকগুলোতে এখনও বিপজ্জনক গ্যাস আছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
এদিকে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও বেআইনিভাবে জাহাজ কাটার কাজ পরিচালনা করার অপরাধে ফেরদৌস স্টিলকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ গত ১২ আগস্ট শেষ হয়ে গেলেও তা নবায়ন না করেই কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। যার দুই দিন পরই এই প্রাণঘাতী দূর্ঘটনাটি ঘটে।