Skip to main content

চট্টগ্রাম বুলেটিন

কিশোর অপরাধ: শাস্তির চেয়ে প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনই অধিক কার্যকর

সাইফুল ইসলাম
একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি তার তরুণ ও কিশোর প্রজন্ম। কিন্তু যখন এই প্রজন্মের একটি অংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং রাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক কাঠামোর দুর্বলতার প্রতিফলন।অনেক কারণেই কিশোরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পারিবারিক সমস্যা। বাবা মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া, পারিবারিক কলহ, পর্যাপ্ত স্নেহ ও তত্ত্বাবধানের অভাব। অনেক ছোট পরিবার থাকে যাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী। তাদের সন্তানদের নিজেরা ঠিকমতো দেখাশুনা করতে পারে না। অতিরিক্ত কঠোর ও অবহেলামূলক আচরণ ও প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য পরিবারই প্রধান ভূমিকা রাখে। তারপরে রয়েছে বন্ধুবান্ধবদের প্রভাব। বন্ধুদের উৎসাহে মাদক চুরি, মারামারি মাদকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। দারিদ্র্যতা অন্যতম সমস্যা। দারিদ্রতার জন্য অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সামাজিকীকরণ ও অন্যতম ভূমিকা রাখে। অপরাধপ্রবণ ও সহিংস এলাকায় বেড়ে উঠা প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি বেকারত্ব অন্যতম একটা সমস্যা আমাদের বাংলাদেশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা এবং সহিংসতার ঘটনায় কিশোরদের সম্পৃক্ততা সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ধারাবাহিক গ্রেপ্তার অভিযানের পরও তাদের থামানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের নেপণ্যে সমাজের প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক ও সামাজিক কারণ ছাড়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পিছনে গডফাদাররা ও দায়ী।তারা এই কিশোরদের ব্যবহার করে চাঁদাবাজি,জমি দখল, ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার ও মাদক ব্যবসাসহ নানান অপরাধমূলক কাজে লাগান। এমনকি অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করেন।পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও জামিনে ছাড়িয়ে আনেন। যার কারণে তারা কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে এই অপরাধমূলক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিশেষ করে চট্টগ্রামে এই অপরাধের হার ক্রমশই বেড়ে চলেছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের(সিএমপি)একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি পুলিশ চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের একটি তালিকা করেছে। তাদের তালিকা মতে চট্টগ্রাম শহরে ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।এসব দলে পাঁচ থেকে ২০জন সদস্য আছে। এসব কিশোর গ্যাংদের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে স্থানীয় নেতারা, আছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলরা।

অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়, কিশোর অপরাধ (Juvenile Delinquency) হলো ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যক্তির আইনবিরোধী আচরণ, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে। তবে আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান মনে করে, একজন কিশোরকে শুধু “অপরাধী” হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালে থেকে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিশোর অপরাধ ব্যক্তিগত দোষের চেয়ে সামাজিক ব্যর্থতার ফল।

সমাজবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ডের (Edwin H. Sutherland) Differential Association Theory অনুযায়ী, মানুষ অপরাধ নিয়ে জন্মায় না; বরং পরিবার, বন্ধু, গ্যাং এবং সামাজিক পরিবেশের মাধ্যমে অপরাধমূলক আচরণ শিখে। অন্যদিকে রবার্ট কে. মার্টনের (Robert K. Merton) Strain Theory বলছে, সমাজে বৈধ উপায়ে সাফল্য অর্জনের সুযোগ সীমিত হলে কিছু মানুষ অবৈধ পথ বেছে নেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক ভাঙন, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি এই তত্ত্বগুলোর বাস্তব প্রতিফলন।

ডিজিটাল যুগে কিশোর অপরাধের ধরণও পরিবর্তিত হয়েছে। আগে যেখানে চুরি, মারামারি বা ভাঙচুর বেশি দেখা যেতো। এখন সাইবার বুলিং, ফেসবুক আইডি হ্যাকিং, অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়ে অর্থ আদায়, ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল এবং অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধও বেড়েছে। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি ডিজিটাল নৈতিকতা শেখানো আজ সময়ের অন্যতম দাবি।

বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। এই আইনে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থা, শিশু আদালত, প্রবেশন অফিসার এবং পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মূল দর্শন হলো—একজন কিশোরকে এমন সুযোগ দেওয়া, যাতে সে সংশোধিত হয়ে সমাজে সম্মানের সঙ্গে ফিরে আসতে পারে। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেন তার সারাজীবনের পরিচয় হয়ে না দাঁড়ায়।

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবার সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। অভিভাবকদের সন্তানের মানসিক পরিবর্তনের প্রতি সচেতন থাকতে হবে। বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং, নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণ, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।

কিশোর অপরাধ দমনে কঠোর শাস্তি তাৎক্ষণিক ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান দেয় না। একজন কিশোরকে যদি শিক্ষা, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে সে সমাজের বোঝা নয়, বরং সম্পদে পরিণত হতে পারে। তাই কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অপরাধ দমন নয়; বরং এমন একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে কোনো কিশোর অপরাধের পথে পা বাড়ানোর আগেই সঠিক দিকনির্দেশনা পায়।

“একজন কিশোরকে শাস্তি দিয়ে একটি অপরাধ থামানো যায়; কিন্তু তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে এনে একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা যায়।”

 

লেখক: শিক্ষার্থী, ক্রিমিনলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ (২০২৫-২৬ সেশন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Tags :

সর্বশেষ