মোঃ জয়নাল আবেদীন, সীতাকুণ্ড:
শনিবার (৮ই মার্চ) ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নানা আয়োজনে সারাবিশ্বে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশেও পালিত হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। তবে এদিনেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতে ঘটে এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা। এক তরুণীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে শেষ পর্যন্ত ওই তরুণীর ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।
শুরুতে তরুণীর দেওয়া এক বক্তব্যে সে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে বক্তব্য দেন। আর শনিবার বিকালে ফেসবুকের বদৌলতে ওই ভিডিওটি চারদিকে চাউর হলে সীতাকুণ্ডের সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। যদিও খবর পেয়ে পুলিশ তরুণীর মা, ভাই ও বন্ধুকে থানা হেফাজতে নিলে জিজ্ঞাসাবাদ তরুণী ঘটনা ব্যাখা বদলান।
জিজ্ঞাসাবাদে গণধর্ষণ বা ধর্ষণের মতো কিছুই ঘটেনি বলে বর্ণনা দেন ওই তরুণী। আর এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ার খবরে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়। তরুণীকে থানায় আনার আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে গণধর্ষণ করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ হয়ে যায়। কেউ কেউ সে সেসব সংবাদদাতা তুলোধুনো করেন। আবার কেউ বলছেন তরুণীটি আসলেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। হয়তো চাপের মুখে সে অস্বীকার করেছেন। আবার অনেকেই বলছেন, যেখানে ওই তরুণী দুই থেকে তিনজন পুরুষ নিয়ে সৈকতে বেড়াতে গিয়েছেন। সেখানে একদল যুবক তাকে গণধর্ষণ করার চেষ্টা করা হাস্যকর। ঘটনাটি ওই তরুণীর প্রেমিক ও বন্ধুদের মধ্যের দ্বন্দ্বের।
এদিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। ধর্ষণের ঘটনায় যখন উত্তাল সারাদেশ। ঠিক সেই মূহুর্তে তরুণীর গণধর্ষণের বিষয়টি সীতাকুণ্ডে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভিক্টিম তরুণী তার ভাই ও বন্ধুকে নিয়ে গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে যায়। এক পর্যায়ে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নেয়ার চেষ্টা করলে সে চিৎকার চেঁচামেচি করে। এতে যুবকরা পালিয়ে যায়।তৎক্ষণাৎ মেয়েটির ভাই ও বন্ধু ছুটে আসেন। মেডিকেল রিপোর্ট আসলে বিস্তারিত জানা যাবে। এ ঘটনায় ধর্ষণের চেষ্টা করা কয়েকজন তরুণকে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টাও করছে পুলিশ। এমনটা জানিয়েছেন সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মজিবুর রহমান।
চট্টগ্রাম বুলেটিন প্রতিবেদক খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, কেন ওই তরুণী তার বক্তব্য পাল্টে ফেলে। কেন সে ঘটনাস্থলে দেওয়া ভিডিও ক্লিপের বক্তব্যের বিপরীত চিত্র তুলে ধরে পুলিশ প্রশাসনের কাছে।
এ বিষয়ে তরুণীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্কুল পড়ুয়া নবম শ্রেণীর ছাত্রী নাদিয়া (ছদ্মনাম) ধর্ষনের শিকার হয়েছে। আর এতে তার বয়ফ্রেন্ডেরও যোগসাজশ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত যুবক রিপন ওই তরুণীকে গভীর জঙ্গলে ধর্ষণ করার পর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ ও তার অন্য সহযোগী জোরপূর্বক জঙ্গলে তুলে নিয়ে যায়।
রিপন জানান, এরপরে তাদের মধ্যে কি হয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে আমি জানি না। আমি এখানকার স্থানীয় না হওয়ায় তাদের বাধা দিতে পারিনি। আপনারা আমার নামে চাইলে মামলা দেন অথবা আমি মেয়েটিকে বিয়ে করতে সম্মত আছি।
যদিও রাজনৈতিক প্রভাবে ও প্রশাসনের ওপর চাপ ঘটনার সত্যতা মুহূর্তে পাল্টে যায় বলে জানা গেছে।ধর্ষণে অভিযুক্ত চার যুবক হলেন, মোঃ রিপন (৩৫)। সে সন্দ্বীপ উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। গুলিয়াখালীর নুর আলম ভূঁইয়ার ছেলে মোঃ পারভেজ ( ২৭), একই গ্রামের রমজান আলী বাড়ির বাসিন্দা শাহজাহানের ছেলে মোঃ হাসান (৩০) ও খোরশেদ মেম্বার বাড়ির কালামের ছেলে নজরুলসহ অজ্ঞাত আরো ৬-৭ জন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম বুলেটিনকে বলেন, গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতে দীর্ঘদিন ধরে চুরি, ছিনতাই, শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনা রাজনৈতিক প্রভাবে আবার হুমকি ধমকি দিয়ে মোটা অংকের টাকায় মিমাংসা করে ফেলা হচ্ছে।আজকের ঘটনার সঙ্গে শুধু চারজন নয় আরো ১০-১২ জন বখাটে যুবক জড়িত। এদের অপকর্মের কারণে এলাকার বদনাম হচ্ছে। আমাদের সম্মানের উপর আঘাত আসছে। আর রমজান মাসে কিভাবে একজন মেয়ে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ঘুরতে আসে। এক্ষেত্রে মেয়ের পরিবারকে আরো সতর্ক হতে হবে। তবে আমরা দোষীদের বিচার চাই।
সচেতন মহল বলছে, স্বৈরাচার সরকার হাসিনার পতনের পর একটি চক্র দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সেই সুবাদে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী এবং আওয়ামী সমর্থক হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠী দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে।যাতে তারা বলতে পারে অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হচ্ছে। মূলত নতুন বাংলাদেশে এসব অপকর্মকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে কিছু লোভী এবং স্বার্থান্বেষী মহল।।এক্ষেত্রে প্রশাসনের আরো মনোযোগী হতে হবে বলে মনে নাগরিকরা। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এমন ঘটনা আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। যে বা যারা জড়িত থাকুক প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যদি কোন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাকে ভিন্ন দিকে মোড় দেয়া হয় তাহলে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সীতাকুণ্ড সার্কেল) মোঃ লাবীব আবদুল্লাহকে একাধিক মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ধর্ষণের বিষয়টি চাপে পড়ে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে কিনা জানতে মুঠোফোনে চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মোঃ সাইফুল ইসলাম সানতু’র সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকেও পাওয়া যায়নি।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মোঃ মজিবর রহমান বলেন, এই বিষয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মেয়েটির ভাষ্যমতে, সে গণধর্ষণের শিকার হয়নি। অভিযুক্ত যুবক রিপন বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে জানালে তিনি বলেন তাহলে সে তথ্য আমাদের দিন। যেহেতু সে ধর্ষনের বিষয়টি স্বীকার করেনি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তার মেডিকেল করাইনি। যদিও এর শনিবার বিকালে গণমাধ্যমের সামনে মেডিকেল করাবেন এবং শনাক্ত হওয়া যুবকদের গ্রেপ্তার করবেন বলে অঙ্গিকার করেন ওসি মজিবুর রহমান। একদিনের ব্যবধানে তিনি সেই বক্তব্য থেকে সরে এলেন।