টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে ভয়াবহ বন্যা ও তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ভৌগোলিক কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল, যার মধ্যে বর্তমানেও ৬০ শতাংশ এলাকার মানুষ কার্যত পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সন্দ্বীপের সাড়ে চার লাখ বাসিন্দার মধ্যে সরকারি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৬০ হাজার বলা হলেও, বাস্তবে পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এই বিশাল সংখ্যক দুর্গত মানুষের জন্য সরকারিভাবে জরুরি ত্রাণ বাবদ বরাদ্দ এসেছে মাত্র দেড় লাখ টাকা; যা হিসাব করলে জনপ্রতি দেড় টাকারও কম পড়ে! সরকারি বরাদ্দের এই চরম অপ্রতুলতা ও বৈষম্য নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে বরাদ্দের এমন সংকটের মাঝেও সন্দ্বীপের বানভাসি মানুষের পাশে ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমজাদ হোসেন।
প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কোমরসমান পানিতে ইউএনও
তীব্র বৈষম্যমূলক সরকারি বরাদ্দ ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াকে পাশ কাটিয়ে নিজেই সরাসরি দুর্গত এলাকায় নেমেছেন ইউএনও আমজাদ হোসেন। মুছাপুরসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও দুর্গম ইউনিয়নের কোমরসমান নোংরা পানি ভেঙে তিনি দুর্গত মানুষের ঘরে ঘরে শুকনো খাবার ও খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। দ্বীপের মূল ভূখণ্ড ছাড়াও দুর্গম উড়িরচরসহ ১৪টি ইউনিয়নেই চলছে তার এই ত্রাণ তৎপরতা। মূলত সরকারি বরাদ্দের চরম ঘাটতি মেটাতে ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব তহবিল এবং স্থানীয় বিভিন্ন উৎস থেকে জরুরি অর্থ ও খাদ্য সহায়তা জোগাড় করে এই অভাবনীয় ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
চিকিৎসা ও তাৎক্ষণিক সেবা
ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানামুখী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। দুর্গতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় প্রতিটি ইউনিয়নে বিশেষ মেডিকেল টিম এবং ত্রাণ বণ্টন ব্যবস্থা স্বচ্ছ রাখতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো জরুরি সহায়তার জন্য সার্বক্ষণিক চালু করা হয়েছে ‘ইউএনও হটলাইন’। এর পাশাপাশি জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসনে দ্বীপের অবৈধ খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর উচ্ছেদ অভিযানেরও ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন।
তলিয়েছে মাছের ঘের ও কৃষিজমি, ঘরে ঘরে হাহাকার
টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে উপজেলার সারিকাইত, মগধরা, মুছাপুর, গাছুয়া, পৌরসভার আংশিক এলাকা, সন্তোষপুর, আমানউল্লাহ ও হরিশপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া মাইটভাঙ্গা, রহমতপুর, কালাপানিয়াসহ আরও কয়েকটি ইউনিয়নের কিছু এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
অধিকাংশ বাড়িঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ওঠায় তলিয়ে গেছে অসংখ্য মাছের ঘের ও কৃষিজমি। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগির খামারের। ফলে পানিবন্দী মানুষ চরম অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন।
ত্রাণ যেন মহাসমুদ্রে শিশিরবিন্দু
প্রশাসনের সাধ্যমতো তৎপরতা সত্ত্বেও প্রয়োজনের তুলনায় মোট বরাদ্দ খুবই সামান্য হওয়ায় এখনও অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যারা ত্রাণ পেয়েছেন, তাদেরও দাবি—তা চাহিদার তুলনায় মহাসমুদ্রে শিশিরবিন্দুর মতো।
সন্তোষপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আজমত আলী ত্রাণ পেয়ে ইউএনও-র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেও ত্রাণের অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমার পরিবারে দশজন খাউইন্যা (সদস্য) আছে। যা পেয়েছি তা দিয়ে বড়জোর একবেলা পার করা যাবে।”
সবচেয়ে মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে মুছাপুর ৩ নং ওয়ার্ডে। সেখানকার বাসিন্দা সাহারা খাতুন ঘরবাড়ি হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি এবং বন্যার পানিতে পুরো ঘরটি ভেঙে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে চুলায় আগুন জ্বালাতে পারছি না। প্রতিবেশীরা কয়েক বেলা খাবার পাঠালেও এখনো সরকারি কোনো সহযোগিতা আসেনি। এভাবে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে।”
তবে সরকারি ও প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও নিজেদের উদ্যোগে দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন।
আমরা কার্যক্রম থামতে দিইনি: ইউএনও
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমজাদ হোসেন বলেন, “অন্যান্য উপজেলার তুলনায় আমরা অনেক কম বরাদ্দ পেয়েছি। এক লাখের বেশি পানিবন্দী মানুষের বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ মাত্র দেড় লাখ টাকা। কিন্তু বরাদ্দ কম হলেও আমাদের কার্যক্রম আমরা এক মুহূর্তের জন্যও থামতে দিইনি। ইউনিয়ন পরিষদের ফান্ড থেকে স্থানীয়ভাবে ত্রাণ বিতরণ চলমান রয়েছে, যা পরবর্তীতে আমরা সরকারি খরচের সাথে সমন্বয় করে নেব।”
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই মানবিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা পুরোপুরি চালু থাকবে জানিয়ে তিনি সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে আরও বড় পরিসরে বানভাসিদের পাশে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।