চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ জানিয়েছেন যে, ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী জানাজার নামাজের জন্য পুলিশের কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি কয়েকজন সাংবাদিককে মুঠোফোনে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট করেন, “জানাজার নামাজে কেন পুলিশ গ্রেফতার করবে? জানাজার নামাজে গ্রেপ্তারের কোনো পরিকল্পনাও ছিল না, অনুমতি নিতে হবে এমনও কোনো কথা নেই।” নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল সম্পর্কেও পুলিশের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নামাজে জানাজায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের জয় বাংলা স্লোগানসহ বেপরোয়া আচরণের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এসব কথা জানান। এমনকি নামাজে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সামনেই জয় বাংলা স্লোগান দিতে থাকে নেতাকর্মীরা। তারেক রহমানকে ভোট চোর উল্লেখ করে মিছিল দিতে দিতে তারা জিইসি মোড়ের দিকে চলে যায়।
সচেতন মহল জানাজার নামাজে এ ধরনের কর্মকান্ডকে শোডাউন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামীরাও প্রকাশ্যে এসে দেখিয়েছেন প্রশাসনের সামনে। এমনকি সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাইদুল ইসলাম ও আশরাফুল কামাল মিঠুকেও দেখা গেছে মিছিলে।
তবে সিএমপির এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিগত ১৭ বছরের আওয়ামী শাসন আমলের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বর্তমান পুলিশের এই সুরকে ‘নাটকীয় পরিবর্তন’ হিসেবে দেখছেন।
বিগত শাসনামলে জানাজায় বাধা ও নির্যাতনের অভিযোগ
ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মতে, বিগত ১৭ বছর শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের মৌলিক ধর্মীয় অধিকারগুলোও হরণ করা হয়েছিল। তারা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছেন:
সাঈদীর জানাজায় বাধা: আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর জানাজাকে কেন্দ্র করে কেন পুলিশ গুলি চালিয়েছিল এবং কেন দেশের বিভিন্ন স্থানে তার গায়েবি জানাজায় বাধা দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জানাযা ও স্মরণ সভায় হামলা: মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগে চট্টলার বীর’ হিসেবে পরিচিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে দণ্ডিত করার পর নামাজে জানাজা পরবর্তী কবরস্থানে ও তার স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কেন ছাত্রলীগের হামলা ও বাধা ছিল, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সমর্থকরা।
নেতাকর্মীদের জানাজায় অংশ নিতে না পারা: মিরসরাইয়ের বিএনপি নেতা গাজী নিজাম উদ্দিন কেন নিজের এলাকায় জানাজা পড়তে পারেননি কিংবা যুবদলের অনেক নেতা কেন নিজ সন্তানের জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী কর্মীরা।
কারাফটক থেকে গ্রেফতার ও সামাজিক বঞ্চনা: কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই কেন বারবার কারাফটক থেকে পুনরায় গ্রেফতার করা হতো? অসংখ্য নেতাকর্মী কেন রাজনৈতিক মামলার ভয়ে নিজ ভাই-বোনের বিয়ে বা মা-বাবার শেষ বিদায়ে অংশ নিতে পারেননি, সেই প্রশ্ন আজ জনমনে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি কুতুব উদ্দিন শিবলী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিবৃতির মাধ্যমে এমন অভিযোগ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কর্মীদের প্রতিক্রিয়া
<span;>বিএনপি ও জামায়াতের তৃণমূল কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো একপাক্ষিক ও ফ্যাসিবাদী স্টাইলে বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। তখন তো নামাজের জন্য অনুমতির অজুহাতে হাজার হাজার মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে।
আজ যখন সিএমপি বলছে জানাজায় অনুমতির প্রয়োজন নেই, তখন নেতাকর্মীরা প্রশ্ন করছেন— বিগত দেড় দশকে যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছিল, তার দায়ভার কে নেবে? তারা মনে করেন, অতীতে পুলিশ যেভাবে জানাজার মতো ধর্মীয় জমায়েতেও গুলি বা বাধা দিয়েছে, তা ছিল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।