“১৬ জুন ২০২১; এই তারিখটি আমার জীবনের ক্যালেন্ডারে শুধু একটি দিন নয়, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এক নির্মম স্মৃতি। সেদিন রাতে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর যা ঘটেছিল, তার ক্ষত আজও আমার শরীরে বহন করছি। আমার পায়ে গুলি করা হয়েছিল, আর সেই গুলির চিহ্ন আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা ভয়ংকর হতে পারে। আমাকে পঙ্গু করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার কণ্ঠকে থামানো যায়নি। আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার প্রতিবাদ আজও অটুট। ইতিহাস সাক্ষী, অত্যাচার কখনো চিরস্থায়ী হয় না।”
কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফ। ২০২১ সালের ১৬ই জুন দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া রাষ্ট্রীয় বর্বরতার সেই দুঃসহ স্মৃতি হাতড়ে এভাবেই নিজের ক্ষোভ ও আর্তনাদ প্রকাশ করেন তিনি।
পুলিশের সোর্স দিয়ে গ্রেফতার ও চাঁদা দাবি
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৬ জুন বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ এক সোর্সের মাধ্যমে সাইফুল ইসলাম সাইফকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর আইনানুযায়ী পদক্ষেপ না নিয়ে, একই দিন রাতে একটি মাইক্রোবাসে করে সাইফকে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন সড়কে ঘোরানো হয়। মধ্যরাতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বায়েজিদ লিংক রোডের এক গহীন পাহাড়ে। সেখানে তৎকালীন বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামান সাইফের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেন। কিন্তু চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানান এই ছাত্রদল নেতা।
ক্রসফায়ার’ নাটক ও পায়ে গুলি
চাঁদা দিতে না পারায় মধ্যরাতেই সাইফুলের চোখে কাপড় বেঁধে গহীন জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওসি কামরুজ্জামান তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,“যা, তুই চলে যা।”
সাইফুল তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাকে ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়ার নাটক সাজানো হচ্ছে। মৃত্যুভয়ে স্তব্ধ সাইফকে কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে। এরপরই শুরু হয় নির্মমতা। প্রথমে একজন কনস্টেবল এবং পরবর্তীতে ওসি কামরুজ্জামান নিজে সাইফুলের পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন। মুহূর্তের মধ্যেই সাইফুলের বুকফাটা আর্তনাদে কেঁপে ওঠে পুরো পাহাড়ি এলাকা। নিস্তব্ধ মাঝরাতে আশেপাশের বাসিন্দারা হয়তো সেই গুলির শব্দ আর আর্তনাদ শুনে শিউরে উঠেছিলেন।
অঙ্গহানি ও মিথ্যা মামলা:
গুলির পর রক্তাক্ত অবস্থায় সাইফুলকে প্রথমে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে চিকিৎসকরা তার গুলিবিদ্ধ পা-টি কেটে ফেলতে বাধ্য হন। চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পরও সাইফুলের ওপর নিষ্ঠুরতা থামেনি; পঙ্গু অবস্থাতেই বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ তার বিরুদ্ধে একটি সাজানো অস্ত্র মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। পরে সংবাদপত্রে জানানো হয়, সাইফুলের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধে তার পা চলে গেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
একজন রাজনৈতিক কর্মীকে এভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার এই ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই নির্মমতা। বিভিন্ন বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা এই ঘটনাকে ভয়াবহ “মানবাধিকার লঙ্ঘন” হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে নোটিশ জারি করে। এছাড়াও ওইসময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রহুল কবির রিজভী ঘটনাটি গণমাধ্যমে ব্যাখা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানান।
আজও সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া পায়ের দিকে তাকিয়ে দিন কাটে সাইফুলের। তবে শরীর পঙ্গু হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ আজও আপসহীন।