শহরে বিলাসী জীবনযাপনে আওয়ামী নেতারা
সীতাকুণ্ডে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যা মামলার আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর সাবেক ডামি, বিতর্কিত সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ দেশ ছেড়েই পালিয়ে গেছেন। গুরুতর অপরাধ ও অঢেল অবৈধ সম্পদের মালিক এসব পলাতক আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত আমি-ডামি নির্বাচনের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আল মামুন ইতিমধ্যেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) সাইদুর রহমান মারুফও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে গেছেন বলে খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তবে শুধু সাবেক এমপি কিংবা তার পিএস-ই নন, সীতাকুণ্ড উপজেলায় একসময়ে মূল ক্ষমতার বলয়ে থাকা জনপ্রতিনিধিদের প্রায় সবাই এখন পলাতক। এদের মধ্যে রয়েছেন ডামি নির্বাচনের উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফুল আলম রাজু এবং উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের শীর্ষ প্রতিনিধিরা। পলাতক চেয়ারম্যানদের তালিকায় রয়েছেন—বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেহান উদ্দিন, সৈয়দপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম নিজামী, মুরাদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বাহার, বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর ওরফে বসুন্ধরা জাহাঙ্গীর, সলিমপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ, বাড়বকুণ্ড চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী ওরফে বালু মিয়াজী এবং কুমিরার সাবেক চেয়ারম্যান মোরশেদ হোসেন চৌধুরী। এছাড়া সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান শেখ মহিউদ্দিনসহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরাও বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে, বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জামিন নিয়ে এলাকায় বহাল তবিয়তে প্রায়সময় যাতায়াত করছেন জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় দশকে সাগরের বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা এবং সরকারি শত শত একর জমি দখল, কোম্পানীগুলোর সাথে আঁতাত করে জনস্বার্থ বিসর্জন দেওয়া এসব কথিত চেয়ারম্যান শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর অবৈধ উপার্জনে নগরের অভিজাত নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতেই দুটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার শ্যালক জনি এখনও এলাকা বীরদর্পে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ গত ১৭ বছরে জিপিএইচ, আবুল খায়ের, বসুন্ধরাসহ অন্তত ৭টি কোম্পানীকে খাস জমি কিনে দিয়ে জনি ও শওকত আলী জাহাঙ্গীর আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, গত ১ থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত মামুনের নির্দেশে সীতাকুণ্ডে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর মরণকামড় দিয়েছিল এই সংগঠিত চক্রটি। তাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও অংশগ্রহণে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়, যা পরবর্তীতে একাধিক হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
স্থানীয়দের দাবি, জুলাই বিপ্লবের হত্যা মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও এরা নিয়মিত সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় আসা-যাওয়া করছে। কিন্তু পুলিশ দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশের এমন নীরব ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন গ্রেপ্তার হলে সেই এসব ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। কেউ কেউ লিখেছেন, বাকিদের খবর কী। ওরা কি জামাই আদরে আছে?
ছাত্র-জনতার স্পষ্ট দাবি, অনতিবিলম্বে এসব পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং তাদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। অন্যথায় ক্ষুব্ধ জনতা কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবে।