Skip to main content

চট্টগ্রাম বুলেটিন

২১ হাজার পুকুর হারিয়ে গেছে চট্টগ্রামে, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়

বেলা আয়োজিত মতবিনিময়ে সভায় বক্তারা

চট্টগ্রাম নগরীর ক্রমাগত জলাবদ্ধতা নিরসন এবং প্রাকৃতিক জলাধার সুরক্ষায় কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং গৃহমালিক ও পুকুর সংরক্ষণকারীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও ‘ইনসেনটিভ’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। একইসঙ্গে নগরীর হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী দিঘিগুলো পুনরুদ্ধারে সকল সেবা সংস্থাকে কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে একই সুরে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নগরীর লালখান বাজারস্থ একটি রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সভায় চট্টগ্রামের নগর-পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার সভাপতিত্ব করেন। এতে মূল নিবন্ধ (কীনোট) উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান।

আইন নয়, চাই ইনসেনটিভ ও আর্থিক প্রণোদনা: সভায় বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চট্টগ্রামে ইতোমধ্যেই প্রায় ২১ হাজার পুকুর ও জলাশয় হারিয়ে গেছে। শুধু আইন দিয়ে বা জরিমানা করে আর পুকুর-জলাশয় রক্ষা করা যাচ্ছে না। পুকুর বা জলাশয় সংরক্ষণকারীদের উৎসাহিত করতে বিকল্প পন্থার ওপর জোর দেন তারা।
বক্তারা প্রস্তাব করেন, যারা নিজেদের প্লটে পুকুর রক্ষা করবেন, তাদের হোল্ডিং ট্যাক্সে ছাড় দেওয়া এবং প্লট প্ল্যান অনুমোদনে বিশেষ সুবিধা দেওয়া উচিত। এছাড়া অন্যদের কাছ থেকে ‘পরিবেশ সারচার্জ’ কেটে সেই অর্থ পুকুর সংরক্ষণকারীদের ইনসেনটিভ হিসেবে দেওয়ার নীতি চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়। নগরীর গ্রীনোরাইজেশন ও ওয়াটার রিজার্ভ এলাকা ধরে রাখার তাগিদও দেওয়া হয়।

হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ: নগরীর ঐতিহ্যবাহী যেসব দিঘি ও পুকুর ভরাটের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে, সেগুলোর কথা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিগণ। বিশেষ করে— চকবাজারের কমলদিঘি, আসকার দিঘি, ঐতিহাসিক লালদিঘি, ভেলুয়ার দিঘি, রাণীর দিঘি, আগ্রাবাদ দিঘি, হাজার দিঘি, বড় দিঘি এবং মুন্সি পুকুরের মতো ঐতিহাসিক জলাধারগুলো আজ বিলুপ্তির পথে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এসব হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এবং অবশিষ্ট জলাশয়গুলো রক্ষায় সিডিএ, ওয়াসা, চসিকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান।

সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও চসিকের ডাম্পিং সংকট: বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরের জলবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে চরম ‘ল্যাক অব কোঅর্ডিনেশন’ বা সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সব সংস্থাকে একই ‘সিঙ্গেল টোনে’ কাজ করতে হবে। পলিসি লেভেলে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়।

সভায় বলা হয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) দুটি বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনই বর্তমানে ওভারলোডেড বা সক্ষমতার অতিরিক্ত বর্জ্যে উপচে পড়ছে। ফলে নালা-নর্দমায় বর্জ্য জমে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হচ্ছে। এনজিওগুলোর ওয়াচডগ (পাহারাদার) ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে সরকার ও সেবা সংস্থাগুলোকে তাদের নিজস্ব দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।

জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অগ্রগতি ও নাগরিক দায়বদ্ধতা: সভায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) পক্ষ থেকে নগরীর মেগা জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সিডিএ অংশের প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মইনুদ্দিন প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরেন।
তবে বক্তারা কেবল সেবা সংস্থাগুলোর ওপর দায় চাপিয়ে হাত গুটিয়ে রাখার মানসিকতা পরিহার করার আহ্বান জানান। তারা বলেন, পলিথিন, প্লাস্টিক ও বাসা-বাড়ির বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা বন্ধ করতে না পারলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পেও জলাবদ্ধতা কমবে না। সর্বাগ্রে জনগণকে সচেতন হতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা এলে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও অনেকাংশে কমে আসবে।

বেলা’র চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন রূবার সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন— চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের (নগর) সহকারী পরিচালক রোমানা আক্তার এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী কাইসার আহমেদ।
এছাড়াও সভায় চট্টগ্রাম নগরীর সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, সমাজকর্মী, শিক্ষক, টেলিভিশন উপস্থাপিকাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন।

Tags :

সর্বশেষ