Skip to main content

চট্টগ্রাম বুলেটিন

টানা বৃষ্টি, জোয়ার আর জলাবদ্ধতায় দুঃসহ নগরজীবন

ইশতিয়াক আহমেদ:


রাতভর বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙলেও ভোরে দরজা খুলে অনেকের মনে হয়েছে, যেন ঘরের সামনে আর কোনো রাস্তা নেই, আছে শুধু জলরাশি। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বুকসমান পানি। অফিসগামী মানুষ আটকে পড়েছেন বাসায়, শিক্ষার্থীরা যেতে পারেনি শ্রেণিকক্ষে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকানের শাটার তুলেও বসতে পারেননি। চট্টগ্রাম যেন আবারও ডুবে গেল পুরোনো এক দুর্ভোগে, যার নাম জলাবদ্ধতা।

গত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। টানা তিন দিনের বর্ষণের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নগরীর আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, কাতালগঞ্জ, শুলকবহর, বাকলিয়া, হালিশহরসহ বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যায়।

সকাল থেকে নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে ছিল পানির রাজত্ব। কোথাও সিএনজি অটোরিকশা চলতে পারেনি, কোথাও বাস চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অফিসগামী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে হাঁটুপানি কিংবা কোমরপানি মাড়িয়ে গন্তব্যে রওনা দেন। জলাবদ্ধতায় ডুবে যায় অসংখ্য বাসাবাড়ি ও দোকানপাট। বাসিন্দাদের অনেকেই ঘরের আসবাবপত্র উঁচু করে রাখতে ব্যস্ত সময় পার করেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

অতি ভারী বর্ষণে নগরীর পরিবহন ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ষোলশহর এলাকায় রেললাইন পানির নিচে চলে যাওয়ায় ৮১৬ জন যাত্রী নিয়ে পর্যটক এক্সপ্রেস কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে তিনটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় চলে যায়।

এদিকে টানা বৃষ্টির প্রভাবে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পতেঙ্গা এলাকায় আউটার রিং রোডের একটি অংশ ধসে পড়ায় বিমানবন্দরমুখী সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। সোমবার দিবাগত ভোররাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশের অংশটি ধসে যায়। এতে নিরাপত্তার স্বার্থে সড়কের এক পাশ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সংস্কারের কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্যবাহী ট্রাক এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগামী যানবাহনের অন্যতম প্রধান রুট হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ না হলে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, কনটেইনার পরিবহন এবং বিমানবন্দরমুখী যান চলাচলে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাহাড়ধসের কারণে নগরীর টাইগারপাস ও জামালখান এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। ঝুঁকি এড়াতে কয়েকটি স্থানে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

প্রবল বর্ষণের মধ্যে বিকেলে নগরীর পাঁচলাইশ থানার রহমাননগর আবাসিক এলাকার ‘বি’ ব্লকে পাহাড়ধসে শফিকুল রহমান নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। তিনি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। এ ঘটনায় মর্জিনা বেগম, সোহান এবং দুই বছরের শিশু ছাইফাসহ তিনজন আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

ভেজা কাপড়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এক অফিসগামী কর্মজীবী। তিনি বলেন, “যাদের এই সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব, তারা তো আমাদের এই কষ্ট দেখেন না। জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ শুধু সাধারণ মানুষই ভোগ করে। বর্ষা এলেই অফিসে যেতে পারি না, আবার বাসায় ফিরতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির মধ্যে আটকে থাকতে হয়। এখনো হাঁটুসমান পানি, আর বৃষ্টি বাড়লে সেটা কোমর ছাড়িয়ে যাবে। প্রতিবছর একই কষ্ট হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আর চোখে পড়ে না।”

আগ্রাবাদের এক বাসিন্দা বলেন, “একটু বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। রাস্তাঘাট উঁচু করা হয়েছে, কিন্তু জলাবদ্ধতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। কখনো হাঁটু, কখনো কোমরসমান পানি জমে। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না। পানি যাতে দ্রুত নিষ্কাশন হয়, সেই ব্যবস্থাই সবচেয়ে জরুরি।”

বাকলিয়ার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, “পানির কারণে দোকান খুলে ব্যবসা করতে পারছি না। ক্রেতা আসতে পারছে না, আমরাও চলাচল করতে পারছি না। প্রতি বছর একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়ি। শুধু প্রকল্পের ঘোষণা দিলে হবে না, সব সংস্থাকে নিয়ে বাস্তবসম্মত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকভাবে নামতে পারেনি। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে যেতে না পেরে নগরীর নিচু এলাকায় জমে থাকে। অনেক খাল ও ড্রেনের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এবং কিছু জায়গায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাজ পুরোপুরি শেষ হলে নগরীর জলাবদ্ধতা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে। অন্যদিকে সিটি মেয়র জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, কয়েক বছর ধরে চলমান এই প্রকল্পের সুফল তারা কবে হাতে-নাতে পাবেন? প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগে পড়তে হলে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব ফল কোথায়?

চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি নতুন নয়। কিন্তু প্রায় প্রতি বছর একই চিত্র ফিরে আসায় নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাল খনন বা ড্রেন নির্মাণ নয়, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত খাল-নালা রক্ষণাবেক্ষণ, জলাধার সংরক্ষণ এবং জোয়ারের সময় পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বৃষ্টি থেমে গেলে পানি নেমে যাবে, কিন্তু থেকে যাবে হাজারো মানুষের ভোগান্তির স্মৃতি, নষ্ট হওয়া ব্যবসা, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং অনিশ্চয়তা। নগরবাসীর একটাই প্রত্যাশা, আগামী বর্ষায় যেন একই দৃশ্য আর দেখতে না হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি নয়, তারা চান বাস্তব ফল। কারণ, প্রতিবার বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার কাছে অসহায় হয়ে পড়া একটি নগরীর গল্প আর শুনতে চান না চট্টগ্রামের মানুষ।

ইএএম/এমকেএম/চট্টগ্রামবুলেটিন

Tags :

সর্বশেষ