চট্টগ্রামের রাউজানে ঘটে যাওয়া ১২টি কাণ্ডের কোনোটিই রাজনৈতিক হত্যাকান্ড নয় বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক রাষ্ট্রদূত গোলাম আকর খন্দকার। তিনি বলেন কোন নেতার সঙ্গে নেতার দ্বন্দ্বে এসব হত্যাকাণ্ড হয়নি। বরং ইট, বালু, মাটির ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজিকে ঘিরে এসব হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। সন্ত্রাসীদের নিজেদের মধ্যে অন্তকোন্দলই প্রধান কারণ।
শনিবার (২৬ এপ্রিল) বেলা সাড়ে এগারোটায় চট্টগ্রামের কাজির দেউড়িস্থ নাসিমন ভবনের দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় তিনি আরও বলেন, রাউজানে বিগত সময়েও মানুষ যেতে পারেনি, শান্তিতে বসবাস করতে পারেনি। এখনো একই অবস্থা চলছে। এসময় তিনি একের পর এক হত্যাকান্ডের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রাউজানের নোয়া পাঠাই বিপুল সংখ্যক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কাজে এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প দিলে হবে না। এখানে বাহিনীর টহল জোরদার করতে হবে অস্ত্র ব্যবহার করে চাঁদাবাজি খুন ভাল উত্তোলন মাটির ব্যবসা করছে এবং এসবকে ঘিরে প্রতিনিয়ত তাদেরকে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। প্রয়োজনে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে রাউজানে বড় ধরণের অভিযান শুরু করা হোক।
গোলাম আকবর খন্দকার বলেন, রাউজানে ৩৮টি ইটভাটা রয়েছে। বেশ কয়েকটি খাল রয়েছে। যেসব খাল থেকে অবৈধ ও বৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এসব খাল থেকে ভালো উত্তরণের এবং কৃষি জমি থেকে মাটি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই সন্ত্রাসীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। রাউজানে প্রত্যেকটি পরিবহন থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি থেকে আসা গাছের গাড়িগুলো থেকে বড় অংকের চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ৫০টি গাড়ি রাঙ্গামাটি থেকে রাউজান অতিক্রম করে চট্টগ্রাম শহরে আসে। রাউজানে উপজেলা প্রকৌশল অফিস (এলজিইডি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজগুলো যেসব ঠিকাদাররা পাচ্ছেন তাদের কাছ থেকে টেন্ডারের বাবদ চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। অবস্থা এমন যে এক একজনকে তিনবার, চারবার দিতে হচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে বলা হচ্ছে সড়কের জন্য দিয়েছেন, ব্রিজের জন্য দেননি, ব্রিজের জন্য দিয়েছেন কালভার্টের জন্য দেননি। সেখানে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের উপর চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন। এসব চাঁদা কারা তুলছে কোথায় যাচ্ছে তা জনগণের জানা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গেল নভেম্বরে রাউজানের প্রত্যেকটি ইটভাটা থেকে ২ লক্ষ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। সর্বশেষ এই ঈদের আগে ভাটা থেকে এক লক্ষ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এখানে কেউ রাজনীতির সঙ্গে, জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে আমি মনে করছি না করছি না। আমাদের দল চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ সকল অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। যত বড় নেতাই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নেওয়া হবে। সেই ব্যক্তি যদি আমি গোলাম আকবর খন্দকারও হই আমাকেও দল ছাড় দেবে না। এ সময় তিনি কয়েক মাস আগে দলের একজন কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যানকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে শোকজ করার উদাহরণ টানেন। এ সময় তিনি বলেন, আগামীতে দল যাকে ভালো মনে করবে তাকেই মনোনয়ন দেবে। এলাকায় প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে মনোনয়ন পাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই।
এসময় তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি স্বার্থে একটি গোষ্ঠী ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি করছে রাউজানে। সম্প্রতি রাউজানের পশ্চিম গুজরায় চাঁদা না দেয়ায় সড়ক ও জনপদের একটি সেতুর ১১ কোটি টাকার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেখানে ৫, ১০, ১২ ও ১৫ শতাংশ এভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
আমি যদি এসব কাজে জড়িয়ে থাকি আপনাদের কাছে অনুরোধ, অনুসন্ধান করে, সত্য ঘটনা উদঘাটন করার মাধ্যমে দলের সামনে, জাতির সামনে তুলে ধরুন। তিনি আরো অভিযোগ করেন একজন বিএনপি নেতা তার ছোট নেতাকে নির্দেশ দিচ্ছেন কোন কোন জায়গা থেকে বালু তোলা হবে এবং কারা কারা ভাগ পাবেন। এসময় তিনি রাউজানে বৈধ ও অবৈধ সকল রকম মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন বন্ধ করার জন্য জেলা প্রশাসন ও সরকারের কাছে দাবী জানান। একইসাথে প্রশাসনের বড় ধরনের অভিযান করে অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের করার দাবি জানান।
এ সময় তিনি রাউজানের পথের হাট, পাহাড়তলী চৌমুহনী, গহিরা মুন্সিরঘাটা, নোয়াপাড়া, গহিরা চৌমুহনী এই পাঁচটি স্পটে পর্যাপ্ত সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানান। তিনি বলেন, সম্প্রতি ইব্রাহিম নামে নিহত হওয়া যুবক মাটি কাটার দ্বন্দ্বে নিহত হন। কিন্তুু এসবহত্যাকাণ্ডকে দলীয় ঘটনা হিসেবে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কোন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হোক সেটি আমরা চাই না।
বিএনপি চেয়ারম্যানের এই উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘বিগত কয়েক মাসে রাউজানে বিভিন্ন অস্ত্র-শস্ত্র কেনা হয়েছে। এটা অনেকেই জানেন, হয়তো প্রশাসনও জানেন। সুতরাং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার জন্য রাজনীতির ছত্রছায়া ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দলের মধ্যে আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। আমাদের নামে অসংখ্য মামলা। আমি জীবনে কাউকে একটা ঢিল মারিনি। আমাকে রাজপথের মিছিল থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন আমি কারাগারে ছিলাম। শুধু আমি না, আমাদের অনেক নেতাকর্মীর নামে মামলা আছে। কিন্তু সেই সুবাদে এখন কেউ যদি অপরাধ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশে বসে থাকে তাহলে আমাদেরকে ফাইন্ডআউট করা উচিত। সেটাকে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া উচিত বলে মনে করি।’
তিনি আরো বলেন, রাউজানে কোন হত্যাকাণ্ড ঘটলে একটি পক্ষ কাকে কাকে মামলায় সেই জড়ানো হবে সেই তোড়জোড়ে নেমে পড়েন। এরপর তাদের কাছে চাঁদা চাওয়া হয় এবং বলা হয় টাকা দিলে মামলা থেকে নাম বাদ যাবে। এমন ঘটনা এখন অহরহ।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, রাউজানে হত্যার শিকার ব্যক্তিরা আগে কোন দল করতো, অধুনালুপ্ত এলডিপির সদস্য কিনা, আওয়ামী লীগ করতো কিনা এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। অনেকেই এখন দল বদল করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও বিএনপির সঙ্গে মিশে গিয়ে এসব অপকর্ম করছে এবং এসব অপকর্মের দায় আমাদের দলের ঘাড়ে আসছে। এ সময় তিনি বলেন রায়হান, ছোটনসহ যারা অভিযুক্ত হয়েছে তারা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের অতীত কর্মকাণ্ড, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছবি যাচাই বাছাই করলে ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আমাদের দলের কেউ জড়িত থাকলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব। এসময় এসব ঘটনা প্রকৃতপক্ষে কারা ঘটাচ্ছে? আপনার অভিযোগ কার প্রতি সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে বলেন, আমি দলের একটি দায়িত্বে আছি। কারোর নাম বলতে এখানে আসেনি, দলের অবস্থান পরিষ্কার করতে এসেছি। প্রশাসন ও সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করলে আসল ঘটনা প্রকাশ পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ হানিফ, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস চৌধুরী, কাজী সালাউদ্দিন, মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ নুর মোহাম্মদ, ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, ফটিকছড়ি পূর্ব জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আজিজুল্লাহ বাহার, রাউজান উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক জসিম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহার, বিএনপি নেতা আবুল হাসনাত, সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এম এ তাহের, মিরসরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল আউয়াল চৌধুরী ও আজিজুর রহমান চৌধুরীসহ যুবদলের নেতাকর্মীরা।
উল্লেখ্য গেল ৮ মাসে রাউজানে ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে ৮টি রাজনৈতিক আর ৪টি পারিবারিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক। এসব ঘটনার পর উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকার ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরী একে অপরকে দোষারোপ করে আসছেন। এর আগে রাউজানের পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।