সীতাকুণ্ডে কৃষিজমিতে বালু ভরাটকে কেন্দ্র করে উপজেলার পশ্চিম সৈয়দপুর এলাকায় জামায়াত নেতা জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে আসা একটি দলকে ধাওয়া করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। মসজিদের মাইকে কৃষিজমি রক্ষার ডাক দিলে কয়েক গ্রাম থেকে শত শত কৃষক ঘটনাস্থলে পৌঁছে জসিম বাহিনীকে প্রতিরোধ করে।
সোমবার (২৪ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পালিয়ে যাওয়া সবাই সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ইউনিয়নের জামায়াতের কর্মী-সমর্থক বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় নেতারা।
পশ্চিম সৈয়দপুর বিলে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বহুদিনের। বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে কখনো চাপ প্রয়োগ করে, কখনো সরকারি চাকুরীর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি কৃষকদের কাছ থেকে জমি কিনেছে। দালালচক্রও এ কাজে সক্রিয় ছিল। ইতিমধ্যে বিলে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জমি তারা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে প্যাসিফিক জিন্স অন্যতম।
জানা গেছে, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি বালু ভরাটের দায়িত্ব নেন কুমিরা এলাকার জামায়াত নেতা জসিম উদ্দিন। তার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ জমি ক্রয় করা হয়েছিল। ২৩ নভেম্বর জসিমের নেতৃত্বে একটি দল বিলের ধারে গাছ কেটে ফেলে এবং কৃষকদের ৭ দিনের মধ্যে টমেটো, শিম, লাউসহ সব ফসল তুলে নিতে নির্দেশ দেয়। কৃষকরা জানায়, তাদের কোনো ক্ষেতেই এখনো ফল আসেনি। এত অল্প সময়ে ফসল তোলা সম্ভব নয়। তারা ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত সময় চান। কিন্তু এতে কর্ণপাত না করে জসিম বাহিনী একদিন পর ২৪ নভেম্বর সকাল থেকে বালু ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করে।
বিষয়টি জানাজানি হলে মুলিছা মসজিদ ও বাদশা মিয়া মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে কৃষকদের মাঠে নামতে আহ্বান জানানো হয়। এরপর প্রায় ৪–৫ শত কৃষক বেড়িবাঁধ এলাকায় গিয়ে জসিম বাহিনীকে প্রতিরোধ করে।
ঘটনাস্থলে থাকা সৈয়দপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মোহছেন আলী বলেন, জামায়াতের অন্তত ২০–৩০ জনের একটি দল জোরপূর্বক জমি ভরাট করতে এসেছিল। কৃষকদের বাধার মুখে তারা ২টি রামদা, হকস্টিক, লোহার রড ও মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, পালিয়ে যাওয়া লোকজনের মধ্যে মামুন, এসকান্দর, নবী, আব্দুল হামিদ, সবুজ, আব্দুল কাদের, জামসেদ, হানিফ, ছোট এসকান্দর, স্বপনসহ কয়েকজনকে তারা শনাক্ত করতে পেরেছেন।
কৃষক শওকত হোসেন, যিনি ৫ একর জমিতে শিম, টমেটো ও লাউ চাষ করছেন। তিনি বলেন, আমি প্রায় ৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। একটি জমিতেও এখনো ফল আসেনি। এ মূহুর্তে জমি ভরাট হলে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব। একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন কৃষক নুর উদ্দিন, বাদশাহ, রাসেলসহ অনেকে।
সৈয়দপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর আব্দুর রহমান বলেন, যারা বালু ভরাট করতে গিয়েছেন তারা আমাদের কর্মী-সমর্থক হলেও এটি জামায়াতের সংগঠনিক সিদ্ধান্ত ছিল না। কেন তারা সেখানে গেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উপজেলা জামায়াতের মিডিয়া সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, সীতাকুণ্ডে জামায়াতের আগাগোড়া ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। এসব কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে আমি মজলিশে সূরা থেকে পদত্যাগ করতে চেয়েছি। ৫ আগস্টের আগেও আমি দায়িত্ব পালন করেছি কিন্তু এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি।
জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমীর আলাউদ্দিন শিকদার বলেন, বালু ভরাট করতে যাওয়া ব্যক্তিরা জামায়াতের লোকজন হলেও এটি তাদের ব্যবসায়িক বিষয়। জামায়াত কোনো ব্যাবসায়িক সংগঠন নয়। জামায়াতের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যবসা করতে চায় তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, পশ্চিম সৈয়দপুর বিল সীতাকুণ্ডের কৃষির বিশেষ করে শীতকালীন সবজির হৃৎপিণ্ড। এখানে কৃষি বাধাগ্রস্ত হলে পুরো সবজির বাজারে প্রভাব পড়বে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, কৃষি জমি ভরাটের কোনো অনুমোদন নেই। ফসল নষ্ট করে জমি ভরাট করতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামায়াত নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, প্যাসিফিক জিন্সের জমি ভরাটের দায়িত্ব আমার কাছে আছে। সোমবার সকালে কৃষকদের সঙ্গে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই সমাধান হবে।

এ বিষয়ে জানতে ফ্যাসিফিক জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচাল সৈয়দ এম তানভিরের মুঠোফোনে একাধিক কল ও হোয়াটসএ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে জামায়াত নেতারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ৫ আগস্টের পর থেকে। এমন ঘটনায় হতভম্ব জামায়াতের অনেকে। বিশেষ করে জসিম উদ্দিন ও রেহান উদ্দিনে বিব্রত পুরো জামায়াত। এই অবস্থায় দলটির তৃণমূল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন কোন ব্যবস্থা কি নিচ্ছে দল তাদের বিরুদ্ধে? নাকি রোকন থেকে কর্মী, ওয়ার্ড থেকে জেলা নেতারাও সমান ভাগের অংশিদার?