চট্টগ্রাম বুলেটিন

দক্ষিণ সন্দ্বীপে মাটি খেকোদের তান্ডবে বিপর্যস্ত জনজীবন, বেড়িবাঁধ ধ্বসের আশংকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সন্দ্বীপ

সন্দ্বীপের সারিকাইত ও মগধরা ইউনিয়নে অবৈধ মাটি কাটা ও ট্রাকের বেপরোয়া দাপটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশ আইন তোয়াক্কা না করে এই অবৈধ ব্যবসার নেপথ্যে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম উঠে এসেছে। তাদের ছত্রছায়ায় প্রতিদিন নতুন জেগে ওঠা চরের মাটি লুটে নেওয়ায় হুমকিতে পড়েছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সরকারি অবকাঠামো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সারিকাইত ইউনিয়নের এই অবৈধ মাটি ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রণ করছেন ৬ নং ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি ইদ্রিস এবং সারিকাইত ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি হাশেম মাঝি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দুই নেতার সিন্ডিকেট ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চরের মাটি কেটে বিক্রি করছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গ্রামবাসী জানান, ট্রাকের বেপরোয়া গতি কিংবা ধুলোবালির বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে ইদ্রিস ও হাশেম মাঝির লোকজন তাদের ওপর চড়াও হয়। ভুক্তভোগী এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা অতিষ্ঠ হয়ে কিছু বলতে গেলে তারা গালিগালাজ করে এবং মারতে আসে। তাদের ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”

সারিকাইতের কাজীপাড়া তেমাথা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক অসহনীয় দৃশ্য। রাস্তার ধারের প্রায় প্রতিটি দোকানের সামনে ঝুলছে পলিথিনের পর্দা। ব্যবসায়ীরা জানান, শত শত মাটিবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সৃষ্ট ধুলোবালি থেকে পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী বাঁচাতে তারা পলিথিন ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। কাজীপাড়া তেমাথা থেকে দক্ষিণের রাস্তা ধরে বেড়িবাঁধের দিকে গেলেই দেখা যায় মাটি লুটের রমরমা চিত্র। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নতুন চরের মাটি ভেকু (এক্সক্যাভেটর) মেশিন দিয়ে কেটে ট্রাকে তোলা হচ্ছে।

মাটিবাহী এই ভারী ট্রাকগুলোর চলাচলে কাজী আবদুল আহাদ সড়কে সম্প্রতি নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ কালভার্টে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান বলেন, “দোকানে পলিথিন দিয়েও ধুলো আটকানো যাচ্ছে না। ক্রেতারা আসে না। আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ছি।” পথচারী রহমত উল্লাহ বলেন, “এই ট্রাকগুলোর নিচে চাপা পড়ে প্রতিনয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি।”

শুধুমাত্র নতুন চরের মাটি কাটাতেই থেমে থাকেনি এই মাটি খেকো চক্র। উপকূল রক্ষাকারী বেড়িবাঁধের গোড়া থেকে ভেকু মেশিন দিয়েও মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। মাটি বাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলের কারণে নষ্ট হচ্ছে উপকূল রক্ষাকারী ব্লক বেড়িবাঁধ। এতে নবনির্মিত ব্লক বেড়িবাঁধ ধ্বসের আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারিকাইত ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাছলিমা বেগম বলেন, “রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নষ্ট হওয়ার বিষয়টি আমরা জানি। আমরা বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেছি।” স্থানীয়দের অভিযোগ প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও শুধু আশ্বাসের বুলি শোনাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন ও সন্দ্বীপ থানা পুলিশ। শুধু কথা নয়, এবার অবৈধ মাটি ব্যবসা বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা চান স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে মাটি কাটা হলে সমুদ্রের ঢেউ সরাসরি বেড়িবাঁধে আঘাত করবে, যা ভবিষ্যতে সারিকাইতকে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে ঠেলে দিতে পারে। অবিলম্বে এই রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের হাত থেকে চর ও জনপদ রক্ষার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।

Tags :

সর্বশেষ