ত্রাণ বিতরণ নাকি আত্মপ্রচারের মহোৎসব?
“সরকারি ত্রাণ জনগণের করের টাকায় কেনা। দুর্যোগকবলিত মানুষের কাছে এই ত্রাণ পৌঁছাতে হবে অবশ্যই মর্যাদাপূর্ণভাবে। এক বাটি খাবার তুলে দিতে এতগুলো হাতের প্রয়োজন কেন? এমন দৃশ্য নিঃসন্দেহে দুর্যোগকবলিত মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।”
কোনো এক দুর্যোগে এক বাটি খাবার বা সামান্য ত্রাণের প্যাকেট অসহায় মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে (যা সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফখরুল ইসলামের ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত হয়েছে।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটিমাত্র ত্রাণের সামগ্রী বা খাবারের পাত্র ধরে আছেন সারিবদ্ধ একঝাঁক কর্মকর্তা ও দলীয় কর্মী। আর অপর প্রান্তে মাথা নিচু করে তা গ্রহণ করছেন একজন অসহায় মানুষ।
এই দৃশ্য আমাদের সমাজের এক চরম নির্মম বাস্তবতা ও বিকৃত মানসিকতাকে ফুটিয়ে তোলে।
ত্রাণ কোনো দয়া নয়, জনগণের অধিকার
গত পাঁচ দিনের টানা অতি ভারী বর্ষণে দুর্যোগ কবলিত হয়েছে অনেক এলাকা। জেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিপন্দি। মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। এর মধ্যে ৩ জন শিশু। সরকারিভাবে ২২ মেট্রিক টন চাল ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যার মধ্যে ১০ লক্ষ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল ও ২০ লক্ষ টাকা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল। প্রশ্ন ওঠেছে, যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, তা কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার নিজস্ব পকেটের টাকায় কেনা নয়। এটি সাধারণ মানুষের করের টাকায় অর্জিত রাষ্ট্রের সম্পদ। দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই সহায়তা পাওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, কোনো দয়া বা অনুদান নয়। তবু কেন সেই ত্রাণ দিতে এতো ফটোসেশান?
ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি অসহায়ত্ব
ত্রাণ বিতরণের নামে যারা ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় নামেন, তারা ভুলে যান যে ক্ষুধার্ত মানুষের পেটের তীব্রতা আর তাদের আত্মসম্মান এক নয়। ক্যামেরার লেন্সের সামনে দাঁড়িয়ে ১০-১২ জন মিলে একটা সামান্য প্যাকেট ধরে পোজ দেওয়া শুধু দৃষ্টিকটূই নয়, বরং ওই বিপন্ন মানুষটিকে চরমভাবে অপমান করার শামিল।
সচেতন মহল বলছে, এসব ঘটনা রোধে প্রয়োজন ব্যবস্থার পরিবর্তন ও মর্যাদাপূর্ণ বণ্টন। ত্রাণ বিতরণ হতে হবে সুশৃঙ্খল এবং প্রচারবিমুখ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট বুথের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সম্মানের সাথে মানুষের হাতে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। প্রচারের মানসিকতা বর্জন করতে হবে। জনসেবার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক-কমেন্ট কুড়ানোর এই সস্তা সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। দুর্যোগ মানুষের সহায়-সম্বল কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু তার আত্মমর্যাদা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। আসুন, প্রচারের মোহ কাটিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াই প্রকৃত সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে, প্রচারের ক্যামেরা নিয়ে নয়।