দলকে টুকরো টুকরো করছেন সালাউদ্দিন, অভিযোগ নেতাকর্মীদের
জহিরুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম):
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড-পাহাড়তলী-আকবরশাহ আংশিক) আসনে ধানের শীষের সম্ভাব্য প্রার্থী কাজী মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন ক্রমেই প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠেছেন বলে অভিযোগ করছেন বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। তার নির্দেশ না শোনায় একের পর এক বহিস্কার, পদ স্থগিত, কারণ দর্শানো, কমিটি ভেঙে দেওয়ার মতো শাস্তিও পেতে হচ্ছে নেতাকর্মীদের৷ সর্বশেষ তার ইশারায় উপজেলা যুবদলের একতরফা কমিটি গঠন করে যুবদলকেও বিভক্ত করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন নেতাকর্মীরা৷ ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা ওই কমিটিকে পকেট কমিটি আখ্যা দিয়ে কাজী সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন হাইকমান্ডের কাছে।
৩ নভেম্বর থেকে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার এ নিয়ে সাতজন শীর্ষ , তাগী, দলের দু:সময়ের কান্ডারীকে শাস্তির আওতায় এনেছেন নানা কৌশলে। এরা হলেন, উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক ডাক্তার কামাল কদর, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মোঃ মোরসালিন, উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কোরবান আলী সাহেব, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আলাউদ্দিন মনি ও সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বাবর, সীতাকুণ্ড পৌরসভা ছাত্রদলের সভাপতি ইসমাইল ও সম্পাদক মো. বাবলু। এছাড়াও সীতাকুণ্ড পৌরসভা ছাত্রদলের কমিটি বাতিল ঘোষণা করানো হয়। সর্বশেষ উপজেলা যুবদলের নয়টি ইউনিয়ন এবং সিটির একটি ওয়ার্ডের যুবদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
জানা যায়, এর আগে ছাত্রদল সীতাকুণ্ড উপজেলা শাখার কমিটিও ভেঙে দেন সালাহ উদ্দিনের অনুগত উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার কয়েক হাজার নেতাকর্মী। গত ১৬ ডিসেম্বর কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারীদের নিয়ে উপজেলা যুবদলের কমিটি ঘোষণা হয় কেন্দ্র থেকে। এতে কাজী সেলিমকে সভাপতি ও আনোয়ার হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক ও সালাহ উদ্দিন সিকদারকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়৷ একইদিন আকবর হোসেনকে সভাপতি ও মুহিদুল আবিরকে সাধারণ সম্পাদক এবং জামাল উদ্দিন রাজুকে সিনিয়র সহ-সভাপতি করে সীতাকুণ্ড পৌরসভা যুবদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়।
যুবদলের সভাপতি পদ পেয়েই কাজী সেলিম উদ্দিন পরের দিন ১৭ ডিসেম্বর উপজেলার সব ইউনিয়নের যুবদলের কমিটি ভেঙে দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আবারও চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েই আসলাম চৌধুরীর সমর্থকদের দল থেকে মাইনাস করার মিশনে নেমেছেন কাজী সালাহ উদ্দিন। ঠুনকো অভিযোগ তুলে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি ভেঙে দেয়াসহ নানা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন। বাদ যাচ্ছে না তার চেয়েও বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদও।
এদিকে সব ইউনিয়নের কমিটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি মোলায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন সেলিম উদ্দিনকে স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন।
বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, কাজী সালাহ উদ্দিনের এই রোষানল, প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের এই নোংরা ধারা অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনে বড় ধরনের অস্থিরতা ও সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।
দলীয় সূত্র ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ধানের শীষের সম্ভাব্য প্রার্থী কাজী সালাউদ্দিনের নির্দেশে সীতাকুণ্ড উপজেলা যুবদলের নয়টি ইউনিয়ন এবং ৮১টি ওয়ার্ড কমিটি একযোগে ভেঙে দেওয়া হয়েছে গত ১৭ ডিসেম্বর। ১৬ ডিসেম্বর নব গঠিত কমিটির সভাপতি হয়েই এমন স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী সেলিম উদ্দিন। কর্মীরা জানান, গত ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৪ আসনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ধানের শীষের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কাজী সালাহ উদ্দিনের নাম ঘোষণার পর থেকে কাজী সালাহ উদ্দিন বিএনপিতে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রাসী হয়ে ওঠেছেন৷ এজন্য তিনি তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ইয়াবা ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের কর্মীদেরও দলে অনুপ্রবেশ করাতে ভাবছেন না৷ অস্ত্র হিসেবে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, কমিটি ভেঙে দেওয়াকে বেচে নিয়েছেন সালাহ উদ্দিন এমন অভিযোগ তৃণমূলের। এভাবেই লায়ন অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীর সাজানো মাঠকে অনেকটা টুকরো টুকরো করছেন সালাহ উদ্দিন। ঐক্যের বদলে তিনি নিজেই ভাঙন সৃষ্টি করছেন দলের ভেতরে। যা ভবিষ্যতের সীতাকুণ্ড বিএনপিকেও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কাছে আরও দুর্বল করে তুলবে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, ধানের শীষের সম্ভাব্য প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণে না থাকায় পরিকল্পিতভাবে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নিজের পছন্দের লোকদের দিয়ে সংগঠন সাজাতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িত ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। পৌর যুবদলের কমিটতে ইয়াবা মামলায় ১৪ বার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একজনকে পদ দেওয়া হয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহাবুদ্দিন রাজু বলেন, “জেল-জুলুম সহ্য করে রাজপথে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে একতরফাভাবে কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এটি প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ।”
সীতাকুণ্ড পৌরসভা বিএনপির সদস্য সচিব ছালে আহাম্মদ ছলু বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের আগে এভাবে কমিটি ভাঙা ও বহিষ্কারের রাজনীতি দলীয় ঐক্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়বে।”
উল্লেখ্য, গত ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয়ভাবে কাজী সালাউদ্দিনকে ধানের শীষের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই তার মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবিতে সীতাকুণ্ডে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, মশাল মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সর্বশেষ প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানববন্ধন ও ৫৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা অবিলম্বে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন