Skip to main content

চট্টগ্রাম বুলেটিন

কেন বলা হয় পীতাম্বর শাহ’র দোকানে বাঘের দুধও মেলে?

পুরো চট্টগ্রাম শহর চষে ফেলেও কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি খুঁজে পাচ্ছেন না?”— কোনো চিন্তা নেই, নগরের বক্সিরহাটের বিখ্যাত পীতাম্বর শাহর দোকানে গেলেই তা পেয়ে যাবেন। প্রবাদ আছে, এই দোকানে এমনকি ‘বাঘের দুধ’-ও মেলে! প্রবাদটি হয়তো কিছুটা রূপক, তবে দোকানে দুর্লভ জিনিসের প্রাচুর্য দেখে তা সত্যি বলেই মনে হয়।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম পরিচালক ভাস্কর মাধব বণিক জানান, প্রায় ১৮০ বছর আগে গুরুজীর আদেশে পীতাম্বর শাহ ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে ১৫-২০ দিনে চট্টগ্রামে আসেন। এখানে এসে খাতুনগঞ্জের বক্সিরহাটে দোকান কিনে ব্যবসা শুরু করেন। যে নীতি ও ধারায় তিনি ব্যবসা শিখিয়ে গেছেন, বংশধরেরা আজও তা নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলছেন। এ দোকানে এসে কোনো ক্রেতাকে নিরাশ হয়ে খালি হাতে ফিরতে হয় না।

সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছু পাল্টালেও পীতাম্বর শাহর দোকান রয়ে গেছে সেই আগের মতোই। বর্তমানে চারজন পরিচালক যৌথভাবে এটি পরিচালনা করছেন। তবে প্রতিষ্ঠানের মূল মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠাতা পীতাম্বর শাহর নামটিকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যখন সনাতনী অনেক প্রথাই বিলুপ্ত, তখনো এই দোকানে ঐতিহ্য মেনে আয়োজিত হয় বাংলা নববর্ষের ‘হালখাতা’ উৎসব। বলা যায়, বিলুপ্তপ্রায় এই বাণিজ্যিক ঐতিহ্যটির শেষ ঠিকানা এখন চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জের এই প্রতিষ্ঠানটি।

বিগত ৪০ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ৬৫ বছর বয়সী নবারুন দাশ। তিনি জানান, দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ মূলত ভেষজ ওষুধ ও দুর্লভ নানা উপকরণের খোঁজে এখানে আসেন। এখানে মেলে:
দুর্লভ ভেষজ ও আয়ুর্বেদিক উপাদান: শতমূল, জিনসেং, শিমুলমূল, সোনাপাতা, লোহজারণ, স্বর্ণমাক্ষী, তামাজারণ, অভ্রুজারণ, কাজ্জলীজারণ, মুক্তা ও দস্তা ভস্ম, নিমবীজ, নিমতৈল, পদ্মমধু, বিষমধু, যষ্ঠীমধু, বিজবন্দ, বিজকারক, বনজৈন, বহেড়া, বাসক পাতা, বাবলা ছাল, ভাং পাতা, তুলসী, শালপানি, নাগেশ্বর ফুল, অশোক ও অর্জুন ছাল, অশ্বগন্ধা এবং জয়তুন তেল।

অন্যান্য বিশেষ সামগ্রী: দেশি-বিদেশি কর্পূর, বিভিন্ন ধরণের সিন্দুর, চন্দনগুঁড়া, বিশেষ তেল (কাঞ্চন, কায়াবতি, কডলিভার অয়েল), কস্তুরী, বিভিন্ন ধরনের ধূপ এবং ভারত থেকে আসা দুর্লভ সব উপাদান।

দোকানের নিয়মিত ক্রেতা আন্দরকিল্লার বাসিন্দা শিলা রানী জানান, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে প্রথম এখানে এসেছিলেন। সাধারণত ঘরের সব জিনিস এক জায়গায় পাওয়া যায় না, কিন্তু পীতাম্বর শাহর দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে খাঁটি জিনিস এক ছাদের নিচেই মেলে।

অন্য এক ক্রেতা আয়শা আক্তার বলেন, অতি সামান্য সূঁচ-সুতা থেকে শুরু করে বিয়ের অনেক জিনিসও মেলে এখানে। আমি কালো তিলের (মোল) একটি ওষুধ কিনতে এখানে এসেছি। মুহুর্তেই পেয়েছিলাম। তিনি আরও বলেন, পূজাপার্বণের সরঞ্জাম, ভেজালহীন সুন্দরবনের মধু, কিংবা অতি দুর্লভ সব গাছগাছড়ার ছাল-বাকল— সবকিছুরই বিশ্বস্ত ঠিকানা এই দোকান।

চট্টগ্রাম ইতিহাস-সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা ড. রাজীব চক্রবর্তী মন্তব্য করেন, পীতাম্বর শাহর দোকান কেবল একটি ব্যবসাহিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এখন চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ। শতবর্ষী এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখতে এবং সংরক্ষণে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এগিয়ে আসা উচিত।

Tags :

সর্বশেষ