টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দাদের দূভোর্গের চিত্র সংসদ অধিবেশনে প্রথম তুলে ধরেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। এরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামবাসীর কাছে দু:খপ্রকাশ করেন। তিনি বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন। পরে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে চট্টগ্রামে পাঠান তিনি। তবে তার দুদিনের সফর হয়ে ওঠে ঘটনাবহুল। কেউ কেউ সমালোচনা করলেও মেয়র শাহাদাতের তাৎক্ষণিক ভূমিকা ও সমন্বয় কমিটি গঠনকে ঘিরে আশাবাদী হয়ে ওঠেছে নগরবাসী। এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাঈদ আল নোমানের বক্তব্য ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। নেটিজেনরা বলছেন, যথাসময়ে ঠিক বক্তব্যটি রাখতে পেরেছেন সাঈদ আল নোমান। তিনি স্পীকারের অনুমতি নিয়ে মাত্র ২ মিনিটে বিষয়টি তুলে ধরে একটি সমাধানের পথ তৈরি করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় জলাবদ্ধতাকে নগরীর দীর্ঘ দিনের বড় সমস্যা উল্লেখ করে বিষয়টির গুরুত্ব সরকারকে উপলদ্ধি করাতে পেরেছেন সাঈদ আল নোমান। তার এমন ভূমিকায় অনেকে তার প্রশংসায় সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে ইতিবাচক পোষ্ট করেছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুদিনব্যাপী সফরটি নানা নাটকীয়তা, বিতর্ক এবং প্রশাসনিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। জলাবদ্ধতার বাস্তবতা নিয়ে তার মন্তব্য এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার প্রকাশ্য বিরোধ বন্দরনগরীর দীর্ঘদিনের এই সমস্যাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
সংসদে আলোচনা ও প্রধানমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ
চট্টগ্রামের এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে খোদ জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। নাগরিক দুর্ভোগের বিষয়টি সংসদীয় আলোচনায় তার বক্তব্যের মাধ্যমে ওঠে এলে সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামবাসীর প্রতি দুঃখপ্রকাশ করা হয়। এই প্রেক্ষাপটেই জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চট্টগ্রামে আসেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী।
‘শহর পানির ওপর ভাসছে না’: প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যে বিতর্ক
বুধবার রাতে জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, “চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে না”। তার মতে, অতিবৃষ্টিতে সাময়িকভাবে পানি জমলেও তা দ্রুত নিষ্কাশন হয়ে যাচ্ছে। তবে কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত নগরবাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে এই বক্তব্যের মিল না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই এই মন্তব্যকে ভুক্তভোগী মানুষের সাথে ‘নির্মম তামাশা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রশাসনিক বৈঠকে বাকবিতণ্ডা ও সমন্বয়হীনতা
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এবং অস্থিরতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:
মেয়রের সাথে বিব্রতকর পরিস্থিতি: ব্রিফিংয়ের সময় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের এক মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে প্রতিমন্ত্রী তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “তাহলে আপনি বলেন”। এমন আকস্মিক প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সিডিএ চেয়ারম্যানকে ভর্ৎসনা:
বৈঠকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যানের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন প্রতিমন্ত্রী। তিনি সরাসরি সিডিএ চেয়ারম্যানকে ‘সরকার বিরোধী লোক’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং খাল সংস্কার কাজে সিডিএর দুর্বলতাকে দায়ী করেন। প্রতিমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সিডিএর অদক্ষতার দায় চসিক মেয়রের ওপর চাপানো হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করা: সমালোচনার মুখেও নিজের অবস্থানে অনড় থেকে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, জলাবদ্ধতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভুয়া খবর’ ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। তিনি ঘুরে দেখেছেন বাস্তবতা ভিন্ন। েএ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কের মুখে পড়েন।
জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রামে ৩৬টি খালের সংস্কার কাজ চলমান আছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর খাল ও নালাসমূহ বছরজুড়ে সচল রাখা এবং বিভিন্ন সেবামূলক কাজের কার্যকর সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উপস্থিতিতে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের এক অফিস আদেশে গঠিত কমিটিতে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে আহ্বায়ক ও চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এছাড়াও কমিটিতে ওয়াসা, সিডিএ, বিদ্যুৎ, সিএমপি, বন্দরসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিগণকে সদস্য করা হয়।
বৈঠক শেষে চসিক মেয়র বলেন, গতবছর আমরা ছয়মাস বর্ষা পেয়েছিলাম। এবারও এই সময়ের কম হবে না। আমরা কাউকে দোষারোপ করতে চাইনা। সিডিএ, ওয়াসা, সিটি করপোরেশনসহ সবকটি সংস্থা একসাথে নগরবাসীর দূর্ভোগ লাগবে কাজ করতে চাই। আমরা এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সামনে পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করতে চাই। এসময় মেয়র সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের বিষয়ে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন এবং পরামর্শ দেন।
কমিটির উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সদস্যরা হলেন, ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার, চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন)। এছাড়াও সিডিএ’র সদস্য (প্রকৌশল) এবং জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক। এছাড়াও সিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রতিনিধি এবং খাল ও জলাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞ শাহরিয়ার খালেদকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চসিক সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে কমিটির জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ১. চট্টগ্রাম মহানগরীর সকল খাল ও পানি নিষ্কাশন নালাসমূহ সারা বছর সচল রাখা নিশ্চিত করা। ২. বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। ৩. জনস্বার্থে জলাবদ্ধতা নিরসনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের তদারকি করা। ৪. প্রয়োজনে দ্রুত নতুন প্রকল্প গ্রহণ এবং চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন সরাসরি তদারকি করা। ৫. নিয়মিত সভা আহ্বানের মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সরকারকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করা। বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব আশফিকুন নাহার স্বাক্ষরিত এই আদেশে আরও বলা হয়, কমিটি প্রয়োজনে যেকোনো দপ্তর বা সংস্থার সদস্যকে কো-অপ্ট করতে পারবে। চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে এই কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।