চট্টগ্রাম বুলেটিন

প্রবাসীর জমি দখল করে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীর বাড়ি, নেপথ্যে চসিক কর্মচারী দেবর

চট্টগ্রাম বুলেটিন প্রতিবেদক:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রবাসীর জমি দখল করে বাড়ি করার অভিযোগ ওঠেছে সলিমপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের (৪,৫,৬ ) সাবেক ইউপি সদস্য ও উত্তর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রওশন আরার বিরুদ্ধে। আর তাকে এই কাজে সহযোগিতা করেছেন সাবেক এমপি দিদারুল আলম ও তারই আপন দেবর শহিদুল ইসলাম সাহেদ। যিনি আবার সরকারি কর্মচারীও। তার বিরুদ্ধে চাকরী বিধি লঙ্গন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রদের দমন মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগ আছে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতোকিছুর পরও তিনি সরকারি চাকরীতে আছেন বহাল তবিয়তে। আর তার ভাবী মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আজও অধরা। পুলিশ অভিযান চালালেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

 

ভুক্তভোগী প্রবাসী মেশকাত উদ্দিন ওইসময় একাধিকবার থানায় অভিযোগ করেও কোন কাজ হয়নি। এমনকি মামলা করতে গেলে তাকে ওইসময়ের ভোটহীন এমপি দিদারুল আলমকে দিয়ে মুঠোফোনে শাসানো হতো। বিচার না পেয়ে তিনি বিদেশে ফিরে যেতেন।

অভিযুক্ত রওশানা আরা সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ সলিমপুরের নূর মোহাম্মদ বাড়ির মুজিবুর রহমানের স্ত্রী। আর শহিদুল ইসলাম একই বাড়ির মৃত মফিজুর রহমানের ছেলে। সম্পর্কে তারা দেবর-ভাবী হন। এছাড়াও শহিদুল ইসলাম ছাত্র জীবনে এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সুপারিশে সিটি করপোরেশনে তার চাকরী হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আছে ময়লা বাণিজ্যের অভিযোগ। গত ৪ আগস্ট তিনি সরকারি চাকরী ফাঁকি দিয়ে সীতাকুণ্ডের বিতর্কিত সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ছাত্র হত্যার গডফাদার এস এম আল মামুনের সাথে মিছিলে যোগ দেয়। তিনি সরকারি চাকরী করলেও মামুনের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছেন। ওইসময় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী, ৪ টি হত্যার আসামি সাইদুল ইসলামের পোষ্ট করা এক ভিডিওতে তাকে মিছিলের সম্মুখ সারিতে দেখা গেছে। বন্দর আসনের সাবেক এমপি এ লতিফের সাথেও তার ছিল বিশেষ সখ্যতা। সরকারি কর্মচারী হয়েও মিছিলে অংশ নেওয়ায় অনেকেই তার চাকরীর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

 

এদিকে তার ভাবী রওশন আরার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেছে তিনি প্রবাসী মেশকাত উদ্দিনের নিজ নামে নামজারীকৃত ৪ শকত ও পৈতৃক সূত্রে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মালিকানার ৪ শতকসহ মোট ৮ শতক ভিটা মাটি দখল করে রেখেছে। ২০০৯ সালেই জোরপূর্বক তিনি জমিটি দখল করেন। এরপর সময়ের সাথে সাথে ইউপি সদস্য হয়ে ওঠলে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এসময় দখল করা জমিতে তিনি বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।

অভিযোগ, জমি নিয়ে যেন প্রবাসী মেশকাত কোন কূলকিনারা করতে না পারে এজন্য শহিদুল ইসলাম মামুনের অংশকে ম্যানেজ করতেন। আর রওশন আরা করতেন দিদারুল আলমকে।

প্রবাসী মেশকাত উদ্দিন প্রতিবেদককে তার নামে জমি থাকার প্রমাণ দিয়ে বলেন, আমি দীর্ঘ দিন দেশের বাইরে থাকি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা আমার বাড়ির জমি দখল করেছে। এর মধ্যে ৪ শতক আমার নিজ নামে। আর বাকী ৪ শতক আমিসহ আমার ভাইদের। আমি যখনই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিষয়টি জানাতাম তখনই আমাকে এমপি দিদার কল করে ভয় ভীতি দেখাতো। বলতো মেশকাত চুপ থাকো, বেশি কথা বলিও না এটা নিয়ে, তুমি বুঝনা ও একজন আওয়ামী লীগ নেত্রী এবং তোমার এলাকার মেম্বার।

তিনি আরও বলেন, রওশন আরা বেগমের পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাদের সমঝোতা করতেন শহিদুল ইসলাম সাহেদ। রওশন আরা সম্পর্কে আমাদের দূরের আত্মীয়। অর্থাৎ আমার চাচাতো বোনের ছেলের বউ। তার শ্বাশুড়ি আনোয়ারা বেগম অর্থাৎ আমার চাচাতো বোন আমার পিতা ডা. ছালেহ আহমেদ গংদের বিরুদ্ধে গোলাভাগের মামলা করেন ২২৫/৮৯ যা পরে অপর মামলা ০১/৯৬ তে রূপান্তরিত হয়। কিন্তুু সেই মামলায় আনোয়ারা বেগম পরাজিত হন। অপরদিকে ডা. ছালেহ আহমেদ গং রায় ও ডিক্রী প্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে আনোয়ারা বেগম আবারও চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ ৫ম আদালতে মামলা করলে আপীল আদালত (আপীল নং ১৭৬/১৯৯৭) রায় ও ডিক্রী বহাল রেখে মামলাটি চালু করার পুনরায় আদেশ দেন।

চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি মেশকাত উদ্দিনের ভাইয়ের স্ত্রী শেলী বেগম মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন সিভিল রিভিশন মামলা ৭৩/২০২৫ দায়ের করলে মহামান্য হাইকোর্ট পূর্বের মামলায় ১৭৬/১৯৯৭ কে রুল এবং চলমান মামলা ১/৯৬ কে স্টে অর্ডার দেন। এতে পূর্বের মামলার রায় ও ডিক্রী ডা. ছালেহ আহমেদের ওয়ারিশদের পক্ষে বলবৎ হয়ে যায়। কিন্তুু রওশান আরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমার ৫৬৭ দাগের ২ গন্ডা জমি দখল করে রাখে।

তিনি আরও বলেন, রওশন আরা ও তার দেবর আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যবহার করে আমার ভাতিজাদেরও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। অথচ ওদের বাড়ি কক্সবাজার। জোরপূর্বক তারা এই জমি দখল করে রেখেছে। আমি আমার জমি ফেরত চাই।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের হালিশহর জোনে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন শহিদুল ইসলাম সাহেদ। অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কারো জমি দখল করিনি। মেশকাত উদ্দিন আমার একটি জমি দখল করে রেখেছে। আমি তার বিরুদ্ধে আমি মামলা করেছি সে ওয়ারেন্টের আসামি।

এসময় তিনি আরও বলেন, আমি মামুন (এস এম আল মামুন) ভাইয়ের কাছে গিয়েছিলাম জমির বিষয়ে। আমি মিছিলের সাথে আসা কি আমার অপরাধ? বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় স্বৈরাচারের পক্ষ নিয়ে মিছিল করেছেন কেন জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তিনি কোন স্লোগান দেননি। আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি নেতাদের সাথে তার ঢের বেশি সখ্যতা রয়েছে। এমনকি অনেক সাংবাদিকের নামও বলেন তিনি। তার দাবি বড় বড় সাংবাদিকের সাথে তার ওঠাবসা। যদিও তার বলা ওইসব সাংবাদিক চট্টগ্রামে ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে ইতিমধ্যেই বিতর্কিত হয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। এমনকি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের পুলিশে তুলে দেওয়ার অভিযোগও আছে শহিদুল ইসলামের সখ্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার রাতে রওশন আরা মেম্বারকে তার মুঠোফোনে অসংখ্যবার কল করা হলেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা দিয়েও কোন সাড়া মিলেনি।

Tags :

সর্বশেষ